ভুয়া জরিপের ছড়াছড়িতে কাঁপছে মার্কিন নির্বাচন: মধ্যবর্তী ভোটের আগে প্রশ্নে আস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মৌসুমে জালিয়াত রাজনৈতিক জরিপ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। অল্প কয়েকটি প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বানোয়াট ফলাফল প্রকাশ করেছে, যার কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম আর জরিপ-সংকলনকারী (পোলিং ট্র্যাকার) প্ল্যাটফর্মগুলোতেও ঢুকে পড়েছে; আর তাতেই প্রশ্ন উঠেছে, মিথ্যা তথ্য কত সহজে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায়। এমন ডেটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, আবার জালিয়াতরা ধরা পড়লে সেই ঘটনাকেই কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী তথ্যের ওপর ভোটারদের সামগ্রিক আস্থা নষ্ট করা যায়।
সর্বশেষ উদাহরণটি ঘটেছে চলতি মাসের শুরুতে। ওয়েজউড পোলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করেছে, টেক্সাস, ওহিও, মিশিগান, কানসাস ও মেইনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ (ব্যাটলগ্রাউন্ড) অঙ্গরাজ্যগুলো নিয়ে তাদের প্রকাশিত পরিসংখ্যান ছিল ভুয়া। প্রতিষ্ঠানটি নিজের কাজকে বর্ণনা করেছে একটি ‘পরীক্ষামূলক প্রকল্প’ হিসেবে, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন জরিপশিল্পের ‘দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং প্রবেশের অত্যন্ত সহজ পথ’ তুলে ধরা।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘আগে জরিপ ও গবেষণা খাতে কাজ করার সময় আমরা দেখেছি, যাচাইহীন ও নিম্নমানের পদ্ধতির উত্থানের পাশাপাশি জরিপের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে।’ বানোয়াট ডেটার পক্ষে তাদের যুক্তি ছিল, ভুয়া জরিপ ভোটার ও গণমাধ্যমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কতটা সহজ, তা পরীক্ষা করা। তাদের ভাষায়, ‘সংক্ষেপে উত্তর: বড্ড বেশি সহজ।’ তবে এই স্বীকারোক্তি এসেছে তখন, যখন তাদের জরিপগুলো ইতিমধ্যে রাজনৈতিক তথ্য-পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বড় সংবাদমাধ্যমেও পৌঁছেছিল। এখন মুছে ফেলা হয়েছে এমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে বিবৃতিটি দেওয়া হয়।
এটি ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে এ ধরনের দ্বিতীয় কেলেঙ্কারি। এর আগে মিডিয়ান স্ট্র্যাটেজিস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আগস্টে স্বীকার করেছিল, তারাও ‘স্বল্পমেয়াদি সামাজিক পরীক্ষা’ হিসেবে ফলাফল বানিয়েছিল।
জুনে যাত্রা শুরু করা ওয়েজউড কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন নিয়ে জরিপ প্রকাশ করে। তাদের ফলাফল রাজনৈতিক প্রচারণা, ভাষ্যকার এবং জরিপের ডেটা সংকলনকারী সংগঠনগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তাদের পোলিং ট্র্যাকারে জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে ওয়েজউডের ১৫টি জরিপ তালিকাভুক্ত ছিল; পরে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কেলেঙ্কারির পর সংবাদপত্রটি বলেছে, ফলাফল অন্তর্ভুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মী, পদ্ধতি ও অর্থায়ন সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল। টাইমস আরও জানায়, ওয়েজউডের জরিপগুলো তাদের নিজস্ব প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা বা জাতীয় কংগ্রেশনাল জরিপের গড়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; তবু ঘটনাটি জরিপের তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার একটি দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
জরিপ সংকলনকারীরা সাংবাদিক ও ভোটারদের বহু গবেষণা সংস্থার ফলাফলের ভিড়ে পথ দেখাতে সাহায্য করে। তাদের কার্যকারিতা নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য গবেষণা আর খারাপভাবে করা বা প্রতারণামূলক কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারার ওপর। ওয়েজউডের কয়েকটি যাচাই পাস করে যাওয়া থেকে বোঝা যায়, কাগজে-কলমে স্বচ্ছতা থাকলেই প্রমাণ হয় না যে গবেষণাটি দাবি অনুযায়ীই করা হয়েছে। ওয়েজউডের খোঁজখবর করা জরিপ ও পূর্বাভাস ওয়েবসাইট ফিফটিপ্লাসওয়ানের মতে, কাঁচা ডেটার অসঙ্গতি এবং জরিপের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কারিগরি শনাক্তকারী (আইডেন্টিফায়ার) দেখেই প্রতিষ্ঠানটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। সেই তদন্তের পরই ওয়েজউড স্বীকার করে, তাদের বেশির ভাগ ফলাফলই ছিল বানোয়াট।
ওয়েজউড জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা অস্বীকার করলেও কয়েকজন জরিপবিশারদ তা মানতে নারাজ; তাঁদের ধারণা, দলটি আরও অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করছিল। ফিফটিপ্লাসওয়ানের তদন্তে যুক্ত ডেটা সাংবাদিক জি এলিয়ট মরিস বলেন, ‘আমরা ওয়েজউডের ডেটা জালিয়াতির তদন্ত করছিলাম। তারা তাদের প্রতারণা ঢাকতে ‘আমরা সামাজিক পরীক্ষা করছিলাম’ অজুহাত দিচ্ছে।’
ভুয়া জরিপের পরিণতি জরিপশিল্পের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে ব্যর্থ হওয়া ম্যালরি ম্যাকমরো বলেছেন, তাঁর সমর্থন এক অঙ্কে দেখানো একটি ওয়েজউড জরিপ তাঁর প্রচারণার ক্ষতি করেছে। জরিপটি তাঁর স্বেচ্ছাসেবীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল এবং সাংবাদিকেরা বারবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর প্রার্থিতা ছেড়ে দেওয়া উচিত কি না। অনুদানও শুকিয়ে গিয়েছিল, কারণ ডেমোক্র্যাটিক সমর্থকেরা অন্য প্রচারণায় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাকমরো ওয়েজউডের ওই জরিপ এবং মিচেল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের আরেকটি জরিপকে ‘একের পর এক আঘাত’ বলে বর্ণনা করে লিখেছেন, সেগুলো তাঁর ‘প্রচারণা শেষ করে দিয়েছে’। জুলাইয়ে তিনি সিনেটের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর লেখায়, ‘তত দিনে আমরা ঝুঁকি নিয়েছিলাম, টাকা খরচ করেছিলাম, বিজ্ঞাপন চলছিল, কাজও হচ্ছিল। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছিল। বাইরের ব্যয় আর আমরা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি—এই বয়ানের চাপে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাকমরোর অভিজ্ঞতা বড় একটি সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে: একটি জরিপ জনমত সঠিকভাবে না মাপলেও, যাঁরা এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন, তাঁদের সিদ্ধান্তে এর ফলাফল প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যান ইনফর্মড পাবলিকের গবেষকেরা অনুসরণ করেছেন, ওয়েজউডের স্বীকারোক্তি নিয়ে আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে ছড়ায়। শুরুতে আলোচনা ছিল মূলত জরিপ বিশেষজ্ঞ আর নির্বাচনী ডেটা অনুসরণকারীদের মধ্যে। পরে গল্পটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভাষ্যকার আর পক্ষপাতদুষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে গতি পায়। কোনো পোস্টে জোর দেওয়া হয়, বড় সংবাদমাধ্যম ও জরিপ সংকলনকারীরা ওয়েজউডের ফলাফল তালিকাভুক্ত করেছিল, এই বিষয়টিতে। অন্যরা এই প্রকাশ্যকে কাজে লাগিয়ে জরিপ সম্পর্কেই প্রশ্ন তোলে, বিশেষ করে যেসব জরিপে ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছে বলে দেখা গেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, বিতর্কটি সেই দাবির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যে জরিপ পদ্ধতিগতভাবে ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থন কম করে দেখাচ্ছে। কেন্দ্রটি তাদের বিশ্লেষণে লিখেছে, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডানপন্থী গণমাধ্যম-পরিবেশ গল্পটির দিকে মনোযোগ টানতে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলোর কয়েকটি ঠিক করে দিতে সফল হয়: মধ্যবর্তী নির্বাচনের জরিপ সংখ্যা, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাওয়া জরিপ সংখ্যা বিশ্বাস করা যায় না।’
মার্কিন নির্বাচনের সততা নিয়ে নিয়মিত মিথ্যা দাবি করে আসা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রকাশ্যকে কাজে লাগিয়ে টাইমসের সমালোচনা করেছেন, কারণ সংবাদপত্রটি ওয়েজউডের জরিপগুলো তাদের ট্র্যাকারে রেখেছিল। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ধরা খেয়েছে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ব্যর্থ নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পর্কে সবকিছুই ‘কৃত্রিম’।’ তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ওয়েজউডের ঘটনা টাইমসের বিরুদ্ধে তাঁর ১৫ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলাকে সহায়তা করবে। তাঁর ভাষায়, ‘তাদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তিশালী মামলা প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোনো আইন নেই, যা সরাসরি ভুয়া জরিপকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। কয়েকটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ও আইনবিশারদ যুক্তি দিয়েছেন, ভুয়া জরিপ প্রকাশ করা পণ্য ও তার-যোগাযোগ (ওয়্যার) জালিয়াতির আওতায় পড়ে এবং এ জন্য ফেডারেল বিচার হওয়া উচিত। ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের (এফসিসি) প্রধান ব্রেন্ডান কার বলেছেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভুয়া জরিপের ‘উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ ঘটেছে; তিনি নেটওয়ার্কগুলোকে সেগুলো প্রচার না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অন্যথায় তারা পরিচালনার লাইসেন্স হারাতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার লিখেছেন, ‘ফেডারেল লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী সম্প্রচারকারীদের সংবাদ বিকৃতি বা সম্প্রচার ধোঁকাবাজিতে জড়ানো নিষিদ্ধ। সম্প্রচারকারীদের জনস্বার্থের দায়িত্ব মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।’ তবে এফসিসির একমাত্র ডেমোক্র্যাটিক কমিশনার আনা গোমেজ কারের মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘যেসব জরিপকারী ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করে, তাদের জবাবদিহি করা উচিত; কিন্তু যেসব সম্প্রচারকারী জনসমক্ষে পাওয়া জরিপের ডেটা প্রতিবেদন করে, একটি জরিপ ভুল হলে তাদের কখনো শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কোনো স্টেশন সরল বিশ্বাসে এই ডেটা প্রতিবেদন করলে এফসিসির সংবাদ বিকৃতি বা ধোঁকাবাজির নিয়ম প্রযোজ্য হয় না।’ ভুয়া জরিপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আইনি প্রতিকার না থাকায় বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, নির্বাচনী ডেটার মান যাচাইয়ের ভার পড়ে গণমাধ্যম ও ভোটারদের ওপরই। পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট অব ক্যালিফোর্নিয়ার (পিপিআইসি) জরিপ পরিচালক মার্ক বালদাসারে বলেছেন, কোন জরিপ আসল আর কোনটি নয়, তা দ্রুত চেনার উপায় আছে; তাঁর পরামর্শ, জরিপের স্বচ্ছতার দিকটি দেখতে হবে।




