এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৩০ সালে বাড়তে পারে ১৬০ শতাংশ, জলবায়ু নিয়ে সতর্ক করল বিএফএফ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা, আর তাতে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তখন এ খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রতি ঘণ্টায় ২৮৭ টেরাওয়াট, যা ২০২২ সালে স্পেনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জার্মানিভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা বিয়ন্ড ফসিল ফুয়েলস (বিএফএফ)। সংগঠনটির মতে, এআইকে জলবায়ু সংকটের সমাধান হিসেবে তুলে ধরার আগে এর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ জলবায়ু কার্যক্রম এবং বিদ্যুতায়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে বলেও তারা বলেছে।
বিএফএফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এআইয়ের জলবায়ু সুফল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাবির ৭৩ শতাংশের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই গবেষণায় গুগল, মাইক্রোসফট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ১৭২টি বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব বক্তব্যে দাবি করা হয়েছিল, এআই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ দাবির সঙ্গে প্রকাশিত একাডেমিক গবেষণার সূত্র ছিল, আর ৩৭ শতাংশ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণই উল্লেখ করা হয়নি।
গবেষণায় চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও কোপাইলটের মতো ভোক্তাপর্যায়ের জেনারেটিভ এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ও যাচাইযোগ্য মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর কোনো উদাহরণ পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে বিএফএফ। সংগঠনটির মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরার সময় প্রযুক্তিটির বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
সংগঠনটির আশঙ্কা, নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা যদি মূলত জীবাশ্ম গ্যাস দিয়ে পূরণ করা হয়, তাহলে জলবায়ুর ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন যুক্ত হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সালে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইডে পৌঁছাতে পারে। বিএফএফের হিসাবে, এই পরিমাণ লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার ২০২২ সালের সম্মিলিত বার্ষিক নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
বিএফএফ বলছে, ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পূরণ করা প্রয়োজন। তবে নতুন ডেটা সেন্টারগুলো যদি অন্য খাতের জন্য পরিকল্পিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে পরিবহন, শিল্প ও ভবন খাতের কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের দাম ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও। এ ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ডের উদাহরণ তুলে ধরেছে বিএফএফ। সংগঠনটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি থেকে ৭১৫ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের মোট বিদ্যুতের ২২ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে ডেটা সেন্টারগুলো। সংগঠনটির দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জ্বালানি সংকটের সময় দেশটির দরিদ্র পরিবারগুলো অতিরিক্ত ২০৯ ইউরো বিদ্যুৎ ব্যয় বহন করেছে।
বিএফএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের চাহিদা সীমিত রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো গেলে ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের পরিবারগুলো আনুমানিক ৪৩৫ ইউরো সাশ্রয় করতে পারে। এ সময়ে আরেকটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও এই সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএফএফ কপ৩১ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট চূড়ান্ত জ্বালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংগঠনটির মতে, বিদ্যুতায়ন তখনই জলবায়ু সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে, যখন তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাবে। তাদের মতে, পরিবহন, ভবন ও শিল্প খাতের বিদ্যুতায়নকে ডেটা সেন্টারের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ ডেটা সেন্টারের বাড়তি চাহিদা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ তৈরি করছে এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর বিদ্যুতায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।




