মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ডিজিটাল জরিপে ঘুষের অভিযোগ, কাজ অসমাপ্ত রেখেই এলাকা ছেড়েছেন সার্ভেয়াররা

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) কার্যক্রমে জমির মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা না দিলে জমি রেকর্ডভুক্ত করা হচ্ছে না। টাকার বিনিময়ে একজনের জমি অন্যজনের নামে রেকর্ড করার অভিযোগও রয়েছে। জরিপের কাজ শেষ না করেই সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়াররা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেক জমির মালিক।
উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চন্দহর ইউনিয়নের ফতেহপুর মৌজা এবং সিংগাইর উপজেলার বিনোদপুর বড়খণ্ড মৌজায় বিডিএসের মাধ্যমে জমি জরিপ ও রেকর্ড তৈরির কাজ চলছে। জমির সঠিক পরিমাপ, মালিকানা নির্ধারণ ও নির্ভুল রেকর্ড তৈরির উদ্দেশ্যে এ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও মাঠপর্যায়ে অনিয়মে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বার্তা গ্রামের মো. সিরাজ অভিযোগ করেন, তাঁর বাবা ও চাচাদের নামে আড়াই বিঘা জমি রয়েছে। এসব জমি রেকর্ডভুক্ত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার প্রতি শতাংশের জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন।
সিরাজ বলেন, ‘জমির দামই যেখানে প্রতি শতাংশ ৩০ হাজার টাকা, সেখানে সার্ভেয়ারদের ৩০ হাজার টাকা করে দিলে জমি রাখব কীভাবে?’ টাকা দিতে না পারায় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাঁর জমি রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, তাঁর ১০ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত করতে ৯ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে জমি রেকর্ড করা হবে না বলেও জানানো হয়। পরে ৯ হাজার টাকা দিয়ে নিজের জমি রেকর্ডভুক্ত করেন তিনি।
হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, একই দাগে তাঁর ভাবির ১০ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত করতে এক দালালের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দাবি করা টাকা দিতে না পারায় তাঁর ভাবির জমি রেকর্ডভুক্ত হয়নি।
ফতেহপুর গ্রামের রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, জমির দলিল ও দখল তাঁর নামে থাকলেও প্রায় ছয় শতাংশ জমি পাশের আরেক ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে এ কাজ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। রেকর্ড সংশোধনের জন্য বিভিন্ন অফিস-আদালতে সংশ্লিষ্টদের খুঁজছেন তিনি। তবে সার্ভেয়াররা ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
স্থানীয় লতিফ নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, জমির জরিপ ও রেকর্ডের কাজ করাতে সংশ্লিষ্টদের হাজার হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। টাকা দিতে পারলে জমি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, আর টাকা দিতে না পারলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও জমি রেকর্ডভুক্ত হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমি আরেকজনের নামে রেকর্ড করার অভিযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
পলি নামের এক জমির মালিকও জরিপের কাজে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জরিপের কাজ শেষ না করেই সার্ভেয়াররা এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় যেসব জমির জরিপ ও রেকর্ডের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে, সেসব জমির মালিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সার্ভেয়ার আলাউদ্দিন বলেন, তাঁদের কাজ আপাতত শেষ হয়েছে। কয়েক মাস পর আবার জরিপের কাজ শুরু হবে। মাঠপর্যায়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, তাঁরা কোনো টাকা নেননি।
সিংগাইর উপজেলা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জরিপের মাঠপর্যায়ের কাজে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুন্নাহার পপি বলেন, ‘জমি জরিপের কাজে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিপে ভুলের কারণে কারও জমি অন্যের নামে রেকর্ড হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।’


