…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › শিক্ষা › খবর
শিক্ষা

এইচএসসিতে টানা দুইবার ফলধস: পাস ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নামায় শিখন ঘাটতি ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষাবিদদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
এইচএসসিতে টানা দুইবার ফলধস: পাস ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নামায় শিখন ঘাটতি ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষাবিদদের
ছবি: সংগৃহীত

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় টানা দুই বছর ধরে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। একইভাবে দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ জনে নেমেছে। অর্থাৎ দুই বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৮২৭টি।

এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩টি। শুধু সামগ্রিক ফল নয়—বিভাগ, বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও অবনতির চিত্র পাওয়া গেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এ ফলের পেছনে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি, করোনা-পরবর্তী ক্ষতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, পাঠদান ব্যাহত হওয়া, শিক্ষক সংকট এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তবে ফলের অবনতির কারণ নির্দিষ্ট করতে বিষয়ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।

বিভাগভিত্তিক ফলে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর মানবিক বিভাগে পাস করেছেন মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী।

মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার আরও কম—৩৫ দশমিক ০১ শতাংশ, এর বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এ বিভাগে ছাত্র ও ছাত্রীর পাসের হারের ব্যবধান ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ পয়েন্ট। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭১ দশমিক ৬০ এবং ছাত্রীদের ৭৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

লিঙ্গভিত্তিক ফলেও ছাত্রীদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে। এবার ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। তাদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও ছাত্রীরা এগিয়ে।

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে কারিগরি শিক্ষার ফল সাধারণ বোর্ডগুলোর গড়ের চেয়েও কম। মাদ্রাসা বোর্ডের ফল তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিক ফলের অবনতি থেকে এ ধারাও মুক্ত নয়।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। এবার তা বেড়ে হয়েছে ২৯৩টি। এক বছরের ব্যবধানে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৪৫টি। এবার তা কমে হয়েছে ১৩৯টি। অর্থাৎ শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ২০৬টি।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে বলেন, করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুফলও প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যায়নি। গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ছিল। এ ছাড়া শুধু গ্রাম পর্যায়ে নয়, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির আরেকটি কারণ হলো গাইড বই ও কোচিং-নির্ভরতা। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় পাঠদান না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী গাইড বই ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু গাইড বই পড়ে প্রকৃত শিখন অর্জন সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, তবে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিলেই হবে না। যারা দুইয়ের বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

তবে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফল বিপর্যয় না দেখে দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, যারা লেখাপড়া করেছে, তাদের জন্য এবারের ফলাফল মোটেই বিপর্যয় নয়। যারা লেখাপড়া না করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে, তাদের জন্য এটি বিপর্যয়।

অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে শিক্ষকের ঘাটতি খুব বেশি নেই। প্রধান সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসে না। শহরাঞ্চল বাদ দিলে দেশের কোনও প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে বলে তাঁর মনে হয় না। সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করে। যারা ক্লাসে আসে, তাদের পাসের হারও বেশি। অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এবারের ফল প্রকাশের পর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষার্থীরা যে নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তাদের ঠিক সেটিই দেওয়া হয়েছে; কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, ফল কমা বা বাড়ার সঙ্গে শিক্ষার মানের সরাসরি সম্পর্ক নেই। শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক জায়গায় পরিবর্তনের পাশাপাশি নম্বর দেওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি।

এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থীকে ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩। তাঁদের মধ্যে তিন বা তার বেশি বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে ২০২৪ থেকে ২০২৬—এই তিন বছরের ফলের ধারাবাহিকতা শিক্ষাব্যবস্থার শিখন, পাঠদান ও মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন কঠোর করা বা অকৃতকার্যদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মৌলিক দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান এবং শিখন ঘাটতি পূরণের কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফলের প্রকৃত কারণ জানতে বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

শিক্ষা বিভাগের আরও খবর

হরিয়ানার পঞ্চকুলায় স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রের হামলায় কেজির ছাত্রী আশঙ্কাজনক, পিজিআইএমইআরে চিকিৎসাধীন
শিক্ষা

হরিয়ানার পঞ্চকুলায় স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রের হামলায় কেজির ছাত্রী আশঙ্কাজনক, পিজিআইএমইআরে চিকিৎসাধীন

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পঞ্চকুলার সংস্কৃতি মডেল স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রের হামলায় কেজি শ্রেণির এক ছাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। তাকে আশঙ্কাজন…

এইচএসসিতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সব পরীক্ষার্থীই পেলেন জিপিএ-৫
শিক্ষা

এইচএসসিতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সব পরীক্ষার্থীই পেলেন জিপিএ-৫

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সব পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে এই তথ্য জানা গেছে। কল…

এআই ভিডিওতে জীবিত দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন নিহত রাকিবুল
শিক্ষা

এআই ভিডিওতে জীবিত দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন নিহত রাকিবুল

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে আনন্দের বদলে শোকে ভারী হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদির আটা গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলামে…

জামালপুরে চার কলেজের ২২ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল, এক কলেজে টানা দুই বছর শূন্য পাস
শিক্ষা

জামালপুরে চার কলেজের ২২ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল, এক কলেজে টানা দুই বছর শূন্য পাস

জামালপুরে এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া ২২ জন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি। চারটি প…