এপস্টাইন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা চূড়ান্তভাবে খারিজ করলেন বিচারক
একজন ফেডারেল বিচারক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে করা বহু বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ করে দিয়েছেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক ড্যারিন গেইলস সিদ্ধান্ত দেন যে প্রেসিডেন্ট মানহানি মামলার জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রকৃত বিদ্বেষ’ (অ্যাকচুয়াল ম্যালিস) মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে সফল অভিযোগের ক্ষেত্রে দেখাতে হয় যে বিবাদী এমন একটি মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ করেছে, যা মিথ্যা জেনে অথবা এর সঠিকতা সম্পর্কে ‘বেপরোয়া অবহেলা’ নিয়ে করা হয়েছে। কিন্তু গেইলস বলেন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলায় ট্রাম্প খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন।
বিচারক লিখেছেন, সংশোধিত অভিযোগটি প্রকৃত বিদ্বেষের অভিযোগ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্বেষসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সিদ্ধান্তমূলক, অস্পষ্ট, কখনো কখনো নিবন্ধটির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং প্রায়ই বক্তব্যগুলো মিথ্যা ছিল কি না বিবাদীরা জানতেন বা জানা উচিত ছিল কি না—সেই প্রশ্নের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। বিচারক এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্পের আইনজীবী দল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত তদন্তের ত্রুটি তৈরি করার চেষ্টা করেছিল।
মামলাটির সূত্রপাত হয় প্রয়াত অসম্মানিত অর্থলগ্নিকারী ও দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পকে যুক্ত করা প্রচারণা থেকে। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ২০০৩ সালে এপস্টাইনের ৫০তম জন্মদিনে উপহার দেওয়া একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ জন্মদিনের নোটের বর্ণনা ছিল। নোটটি ছিল অভিনন্দনপত্রের একটি বইয়ের অংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন অসম্মানিত ব্রিটিশ সমাজপতি ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল, যিনি এপস্টাইনের যৌন পাচার চক্রে জড়িত থাকার জন্য ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ট্রাম্পের বলে উল্লেখ করা নোটটিতে ছিল একটি বক্ররেখাময় নারীর হাতে আঁকা রূপরেখায় ঘেরা টাইপ করা লেখা। নিচে, যেখানে পেলভিক অঞ্চল হতে পারে, সেখানে ছিল ট্রাম্পের স্বাক্ষর।
ট্রাম্প লেখা, স্বাক্ষর ও ছবি—সবকিছুর দায় জোরালোভাবে অস্বীকার করেন। পরে জন্মদিনের চিঠিটির একটি কপি হাউস ওভারসাইট কমিটির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের নিবন্ধটি এমন সময়ে আসে, যখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এপস্টাইনের অভিযোগিত যৌন অপরাধসংক্রান্ত নথি আটকে রেখেছে কি না তা নিয়ে তীব্র যাচাইয়ের মুখে ছিল। ট্রাম্প ও এপস্টাইনের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়েও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। দুজন সামাজিকভাবে মেলামেশা করতেন বলে জানা যায়। ২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেন, এপস্টাইন তাঁর মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে নারী কর্মীদের ‘চুরি’ করার পর তিনি সম্পর্ক শেষ করে দেন।
এপস্টাইন ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক চাওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১৩ মাস জেল খাটেন। ২০১৯ সালে যৌন পাচারসংক্রান্ত ফেডারেল অভিযোগের মুখোমুখি হলেও বিচারের আগে নিউইয়র্ক সিটির কারাগারের কক্ষে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে রায় দেওয়া হয়। আইনি অধিকারকর্মীদের মতে, এপস্টাইনের ভুক্তভোগীদের সংখ্যা কয়েক শ বলে অনুমান করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প সংবাদপত্রটির প্রচারণাকে মিথ্যা, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর বলে আখ্যা দেন। ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মায়ামির ফেডারেল আদালতে দায়ের করা তাঁর মামলায় অভিযোগ করা হয়, পত্রিকা ও এর প্রতিবেদকরা জেনেশুনে ও বেপরোয়াভাবে অসংখ্য মিথ্যা, মানহানিকর ও অসম্মানজনক বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। এতে প্রেসিডেন্টের ব্যাপক আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের নিবন্ধসংশ্লিষ্ট দুই সাংবাদিকও বিবাদীদের মধ্যে ছিলেন।
এপ্রিলে বিচারক গেইলস মানহানি মামলাটি খারিজ করে দেন, রায়ে বলেন ট্রাম্প প্রতিবেদনটি প্রকৃত বিদ্বেষ থেকে জন্ম নিয়েছে তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু সেই প্রাথমিক রায়ে ট্রাম্পকে অভিযোগটি পুনরায় দায়েরের সুযোগ দেওয়া হয়, যা তিনি মে মাসে করেন। হালনাগাদ মামলায় দাবি করা হয়, প্রতিবেদকরা চিঠিটি কীভাবে পেয়েছিলেন ও যাচাই করেছিলেন তা না দেখানোয় ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বেপরোয়া আচরণ করেছে।
শনিবারের মায়ামির রায় ট্রাম্পের এই বিষয়ে মামলা করার চেষ্টায় চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে। গেইলসের সিদ্ধান্ত মামলাটি ‘উইথ প্রিজুডিস’ খারিজ করেছে, যা কার্যকরভাবে একই বিষয়ে ভবিষ্যতে যেকোনো মামলার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আরও মানহানি মামলা চলমান রয়েছে।



