সিডনি অপেরা হাউসে আরডার্ন: আস্থা ফেরাতে আগে গড়তে হবে আর্থিক নিরাপত্তা

নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন বলেছেন, রাজনীতিকদের দ্বিমুখী চিন্তা ও সহিংসতার ভাষা থেকে সরে আসতে হবে এবং গভীর অনিরাপত্তার এই সময়ে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তুলে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। রবিবার সিডনির বিখ্যাত অপেরা হাউসের মঞ্চ থেকে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিকদের উদ্দেশে তিনি এ বার্তা দেন।
লেখক আনা ফান্ডারের সঙ্গে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে আরডার্ন বলেন, রাজনীতিকরা সমাজে মেরুকরণের সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছেন, অথচ তাঁদের আরও ভালো করার কথা ছিল। আলোচনার বিষয় ছিল—মতপার্থক্য থাকলেও আমরা কি বিভক্ত না হয়ে থাকতে পারি?
তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো দ্বিমুখী চিন্তায় না জড়ানো, সহিংসতার ভাষা ব্যবহার না করা; বরং গভীর অনিরাপত্তার সময়ে আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে আস্থা পুনর্গঠন করা।’
আরডার্ন বলেন, ‘এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা করতে পারতাম; কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা পরিস্থিতি আরও খারাপ করছি, ভালো নয়।’
তাঁর ভাষায়, গত কয়েক দশকে বিশ্বায়ন বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে অনিরাপত্তার অনুভূতি বেড়েছে এবং তাঁরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলা শুরু করেছেন। জবাবে রাজনীতিকরা ব্রেক্সিটের মতো প্রস্তাব সামনে এনে বলেছেন, ‘এই হলো দোষী’; আর সেটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের উত্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
৪৬ বছর বয়সী আরডার্ন এখন সিডনিকেই বাড়ি বলছেন। তিনি চলতি বছরের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন এবং সেপ্টেম্বরে শহরের উত্তরের সমুদ্রসৈকত এলাকায় একটি বাড়ি কেনেন। গত সপ্তাহে জানা গেছে, তিনি সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও মেন্টরিং করবেন।
রবিবারের আলোচনাটির প্রচারে দুই বক্তাকে ‘বিশ্বের দুই শীর্ষ চিন্তাবিদ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মেরুকরণ প্রসঙ্গে আরডার্ন বলেন, এখন মতপার্থক্য এত গভীরভাবে ধারণ করা হয় যে প্রত্যেকে মনে করে তার নিজের নৈতিক স্বচ্ছতাই একমাত্র সঠিক, যা অন্য পক্ষ ধারণ করে না। ফলে তাদের সঙ্গে আর আলোচনায় বসাই সম্ভব হয় না; সমস্যা সমাধানের জন্য যে সংলাপ দরকার, তা এতে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বতন্ত্র এমপি হেলেন হেইনসের ওপর অভিযুক্ত হামলার দুই সপ্তাহ পর এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আরডার্ন ঘটনাটির সরাসরি উল্লেখ না করলেও জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতিক ও নেতাদের তাঁদের নিজেদের তৈরি করা আবহের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের মতামত এখন সেখানে লিপিবদ্ধ ও স্থায়ী হয়ে যায়। অথচ সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য নতুন প্রমাণ বা তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করে মত বদলানোর সক্ষমতাই জরুরি; সেই পরিবেশই মাধ্যমটি কঠিন করে তুলেছে।
২০০৮ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সময় আরডার্ন ছিলেন নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ এমপি এবং প্রথম এমপি, যিনি আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিয়ে সংসদে এসেছিলেন। সে সময় অনেক রাজনীতিকের মতো তিনিও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘তথ্যের হেরফেরের দিকটি থাকতে পারে, তা না ভাবাটা ছিল আমার বড় সরলতা।’
আরডার্নের ভাষায়, অনলাইন জগৎ সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলে যায় ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ—ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার দিন। ইউটিউবে উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে হামলাকারী অন্য শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের মধ্যে সহিংসতা উসকে দিতে সেই উন্মাদনা ফেসবুকে সম্প্রচার করেছিল। তখনই তিনি মাধ্যমের ‘অস্ত্রীকরণ’ পুরোপুরি বুঝতে পারেন।
তিনি বলেন, অবিশ্বাস বছরের পর বছর ধরে জমে এসেছে এবং এখন তা ভোটারদের অভিযোগ ও অন্তর্মুখী মনোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে; রাজনীতিকরা তা সামলাতে পারেননি। প্রতিটি পর্যায়ে যেখানে অবিশ্বাস হঠাৎ বেড়ে গেছে, সেখানে মানুষের অনুভূতিতে ভাঙন দেখা গেছে আর রাজনৈতিক জবাব ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সমস্যার মূলে যাইনি; বরং দোষারোপ আর অন্যদের প্রতি অবিশ্বাস দিয়েই সেটাকে অস্ত্র বানিয়েছি। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের শুধু আস্থার সংকট নয়; আমাদের নেতৃত্বেরও সংকট আছে।’
সমাধানের অংশ হিসেবে আরডার্ন সহমর্মিতার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সহমর্মিতা রাজনীতিতে সেই জিনিসটি আনে যা এখন আমাদের নেই। এটি আনে নম্রতা, আনে কৌতূহল। রাজনীতিতে আরও বেশি নম্রতা থাকলে কী বড় পরিবর্তনই না হতো।’



