ছয়টি গরুর খামার থেকে বহু প্রতিষ্ঠানের মালিক: জাতীয় যুব পুরস্কার পেলেন লালপুরের উদ্যোক্তা রায়হান

নাটোরের লালপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা মো. আব্দুল মোত্তালেব রায়হান জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬ অর্জন করেছেন। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যুবসমাজের উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি।
রবিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
লালপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা রায়হান ২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মাত্র ছয়টি গরু নিয়ে খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উদ্যোক্তা জীবন শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি কৃষি, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যাংকিং ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
মৎস্য খাতে স্থানীয় চাষিদের মাছ বিক্রির সমস্যা সমাধানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’। পাশাপাশি মিশ্র ফলবাগানে অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ফল উৎপাদন এবং ‘আশার আলো জৈব সার কারখানা’র মাধ্যমে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন তিনি। তাঁর উৎপাদিত জৈব সার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল চাষেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩০ জনের।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লিড টপার’ ও ‘হলিটেক আইটি’। প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে প্রায় ৩০০ তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ জন কর্মরত রয়েছেন এবং আরও ১০০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
কৃষকদের সেচসংকট নিরসনে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও উদ্যোগের মাধ্যমে লালপুরে ২৪টি গভীর নলকূপ স্থাপনে সহযোগিতা করেন রায়হান। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ডক্টরস পয়েন্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিক সেন্টার’, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ জনের।
এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে তিনি ইসলামী ব্যাংকের গোপালপুর ও আব্দুলপুরে দুটি এজেন্ট শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ ও ২০২১ সালে চালু হওয়া শাখা দুটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৪ জন। পাশাপাশি জনতা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির লালপুর অফিসের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন এবং পিএসপি এক্সপ্রেস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে কুরিয়ার সেবা দিয়ে আসছেন তিনি।
ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখছেন রায়হান। তিনি গ্রীন লালপুর প্রকল্পের সমন্বয়ক, গ্রীন ভয়েসের লালপুর উপজেলা শাখার উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) লালপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। এসব সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় তিনি মাস্ক বিতরণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং অসহায় ও আক্রান্ত মানুষের বাড়িতে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেন। এই কাজে সহযোগিতা করে প্রাকৃতি ফাউন্ডেশন। মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছ থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন রায়হান।
শিক্ষা বিস্তারেও রয়েছে তাঁর অবদান। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়া মেরিনা, ফাতেমা, সানজিদা ও প্রার্থনাসহ একাধিক মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এ ছাড়া প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তাঁর সভাপতিত্বে লালপুরের দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে ‘আলোর দরজা শিশু বিদ্যা নিকেতন’।
জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের এই স্বীকৃতিতে লালপুরের স্থানীয় সচেতন মহল ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, রায়হানের এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।




