কলোরাডোর প্রাক্-প্রাথমিক কর্মসূচি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি: ধর্মীয় স্কুল কি সমকামী পরিবারের সন্তানকে ফেরাতে পারবে

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার শুনানি হচ্ছে এমন এক মামলায়, যেখানে ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের করদাতাদের অর্থে পরিচালিত একটি কর্মসূচি, যার লক্ষ্য রাজ্যের সব চার বছর বয়সী শিশুর জন্য প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। প্রশ্ন হলো, ভেদাভেদ নিষিদ্ধ করে এমন রাজ্য আইন লঙ্ঘন করে ধর্মীয় স্কুলগুলো সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার বাবা-মায়ের সন্তানদের ভর্তি করতে অস্বীকার করতে পারবে কি না।
ডেনভারের আর্চডায়োসিস চায়, রাজ্যের অর্থায়ন পাওয়া ক্যাথলিক প্রাক্-স্কুলগুলো যেন এলজিবিটিকিউ পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারে। মামলাটি তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা আর বৈষম্যবিরোধী আইনের সংঘাতের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার সনদের প্রথম লাইনেই বলা হয়েছে, কংগ্রেস ধর্ম প্রতিষ্ঠা বা ধর্মের স্বাধীন চর্চায় বাধা দিয়ে কোনো আইন করতে পারবে না। দেশটির প্রতিষ্ঠার সময় থমাস জেফারসন এই ধারাকে চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ‘বিচ্ছেদের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে সুপ্রিম কোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ধারণাকেই আইনে পরিণত করে, যা প্রায় এক দশক আগ পর্যন্ত বহাল ছিল।
এরপর আদালতের নতুন রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নাটকীয়ভাবে পথ বদলায়। এখন জোর দেওয়া হচ্ছে বিচ্ছেদের ওপর নয়, প্রথম সংশোধনীর দ্বিতীয় অংশের ওপর—ধর্মের স্বাধীন চর্চা রক্ষার ওপর। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক রাভিচ, যিনি সংবিধানের ধর্ম-সংক্রান্ত ধারা নিয়ে বিস্তর লিখেছেন, বলেন, ‘আইনটি খুব বেশি দিন আগেও যা ছিল, এটি আক্ষরিক অর্থেই তার উল্টো। এটি একটি সম্পূর্ণ বদল।’
অতীতের একটি উদাহরণ হলো ১৯৮৩ সালের রায়, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট ৮-১ ভোটে বলেছিল, বব জোন্স ইউনিভার্সিটি ধর্মীয় কারণে আন্তঃবর্ণ ডেটিং ও বিয়ে নিষিদ্ধ করায় এবং তা বর্ণবৈষম্য হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির করমুক্ত মর্যাদা বাতিল হওয়া উচিত; সরকারি অর্থ এ ধরনের বৈষম্যকে সমর্থন করতে পারে না। তবে এবার আদালত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় (অস্টিন) ও ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডগলাস লেককের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বর্ণের জায়গাটি ‘অনন্য’। তিনি বলেন, ‘২৫০ বছরের দাসপ্রথা, গৃহযুদ্ধ, সাড়ে সাত লাখ মৃত্যু, তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী—অন্য কোনো গোষ্ঠীর জন্য এমন কিছু নেই।’ কলোরাডোর মামলা প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ডেনভার আর্চডায়োসিস বৈষম্য করছে, তবে যোগ করেন, ‘প্রশ্ন হলো, এই বৈষম্য ধর্মের সুরক্ষিত চর্চা কি না।’
কলোরাডোর সর্বজনীন প্রাক্-প্রাথমিক কর্মসূচির পেছনের ভাবনাটি ব্যাখ্যা করেছেন তৎকালীন রাজ্য সিনেট সভাপতি স্টিভ ফেনবার্গ, যার সময়ে আইনটি পাস হয়। কর্মসূচিতে ভর্তি হওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য বছরে ৬ হাজার ৩০০ ডলার সুবিধা দেওয়া হয়, যার অর্থ আসে তামাকের ওপর কর থেকে। ফেনবার্গ বলেন, ‘আইনটি আসলে এমন একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে ছিল, যেখানে আমরা চেয়েছিলাম প্রতিটি শিশু, সে যেখানেই থাকুক, সর্বজনীন প্রাক্-স্কুলে পড়ার সুযোগ পাক।’
এই লক্ষ্যে রাজ্যটি এমন একটি পদক্ষেপ নেয়, যা বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্য নেয়নি। ধর্মীয় স্কুলসহ বিস্তৃত পরিসরের প্রতিষ্ঠানকে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, শর্ত একটাই—স্কুলগুলোকে বর্ণ, ধর্ম, যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা রাজ্য আইন মানতে হবে। সর্বজনীন প্রাক্-প্রাথমিক বিলের প্রধান প্রস্তাবকদের একজন, রাজ্য প্রতিনিধি এমিলি সিরোটা জোর দিয়ে বলেন, রাজ্য চেয়েছিল বাবা-মায়েরা যেন চার বছরের সন্তানকে কোথায় পড়াবেন, সে বিষয়ে ‘যথেষ্ট পছন্দের সুযোগ’ পান।
সিরোটা আরও জানান, ক্যাথলিক চার্চ শুরুতে এই কর্মসূচিকে সমর্থন করেছিল এবং ক্যাথলিক চ্যারিটিজ এখনো এতে অংশ নিচ্ছে। আরও অংশ নিচ্ছে অন্তত ৩৫টি খ্রিস্টান স্কুল, একটি মুসলিম ও তিনটি ইহুদি স্কুলসহ অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীও। ফেনবার্গের ভাষায়, ‘শর্ত হলো, আপনি বৈষম্য করতে পারবেন না, এবং সব শিক্ষার্থীকে অংশ নিতে দিতে হবে।’
জটিলতা শুরু হয় এই শর্ত থেকেই। ডেনভার আর্চডায়োসিস ও দুটি প্যারিশ আইনটিকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের পক্ষে রয়েছে বেকেট ফান্ড ফর রিলিজিয়াস লিবার্টি এবং এর প্রধান নির্বাহী মার্ক রিয়েঞ্জি। রিয়েঞ্জি বলেন, কলোরাডোর আইনটি সরাসরি ক্যাথলিক স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য করছে। তাঁর ভাষায়, ‘তারা শুধু সেসব ধর্মীয় স্কুলকেই বাদ দিচ্ছে, যেগুলো এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত যা কলোরাডোর পছন্দ নয়। আর এটাই সাংবিধানিক সমস্যা।’ তিনি বলেন, ক্যাথলিক হতে হবে এমন শর্ত নেই, তবে ক্যাথলিক শিক্ষাকে সমর্থন করতে এবং প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা না করতে সম্মত হতে হবে—স্কুলগুলো এভাবেই গঠিত। অর্থাৎ চার্চ চায় রাজ্যের বৈষম্যবিরোধী আইন থেকে ছাড়, যে আইন অনুযায়ী সমকামী বা ট্রান্সজেন্ডার বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্য থাকায় চার বছরের শিশুকে স্কুলে ভর্তি করতে অস্বীকার করা অবৈধ।
তবে সব ক্যাথলিক কর্মসূচি একই সুরে চলে না। সাতটি অঙ্গরাজ্যে ক্যাথলিক স্কুল ব্যবস্থায় নেতৃত্বের একাধিক পদে থাকা টিম উল বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে নটর ডেম হাই স্কুলের মিশন ও মিনিস্ট্রি বিভাগের অন্তর্বর্তী পরিচালক। তিনি কলোরাডোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে একটি ব্রিফ দাখিল করা ক্যাথলিক স্কুল পরিচালকদের দলের সদস্য। উল বলেন, ‘আমি ‘আকাশ ভেঙে পড়ছে’—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নই।’ তিনি জানান, তারা অ-ক্যাথলিক শিক্ষার্থী ও পরিবারকেও ভর্তি করে, এবং সেসব পরিবার বোঝে যে নির্দিষ্ট মতবাদের সঙ্গে একমত না হলেও তারা বিঘ্ন ঘটাবে না; মতের বৈচিত্র্যও শিক্ষা অভিজ্ঞতার অংশ।
ডেনভার আর্চডায়োসিসের অবস্থান ভিন্ন। ডেনভার পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আর্চবিশপ জেমস আর. গোলকা লিখেছেন, কলোরাডোর প্রাক্-প্রাথমিক কর্মসূচির ফলে আর্চডায়োসিসজুড়ে ক্যাথলিক স্কুলে ভর্তি ২০ শতাংশ কমে গেছে এবং দুটি প্রাক্-স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, যার একটি ‘সংখ্যালঘু ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে’ সেবা দিত। আর্চডায়োসিসের ক্যাথলিক স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট স্কট এলমার অবশ্য বলেন, এলজিবিটিকিউ বাবা-মায়েরা সন্তান ভর্তির চেষ্টা করেন—এমন ঘটনা ‘খুবই বিরল’; ‘এটি এমন কিছু নয়, যা আমাদের নিয়মিত মোকাবিলা করতে হয়।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া তিন বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল অতিসংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ধর্মীয় অধিকারে এমন বিপ্লব ঘটানোর দিকে যাচ্ছে, যা আগে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি। গত বছর করদাতাদের অর্থে পরিচালিত চার্টার স্কুলে ধর্মীয় স্কুল ও শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কি না, সে প্রশ্নে আদালত সমানভাবে বিভক্ত হয়েছিল। তবে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের কারণে বিচারপতি অ্যামি কনি ব্যারেট নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় বিচারপতিরা মামলাটি বাদ দেন। এবার কলোরাডোর মামলায় ব্যারেট নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, ফলে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ আদালতই থাকছে।
বার্কলে ল স্কুলের ডিন এরউইন চেমেরিনস্কি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় স্কুলের জন্য সরকারকে অর্থ দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট কতদূর যাবে?’ তিনি আরও লক্ষ করেন, সরকারকে ধর্মীয় চার্টার স্কুলে অর্থ দিতে হবে কি না—সেই প্রশ্নও ঝুলে আছে, এবং আদালত কতদূর যেতে ইচ্ছুক, তা জানা নেই। সারা দেশে প্রায় ৮ হাজার চার্টার স্কুল রয়েছে, কলোরাডোতে রয়েছে প্রায় ২৭৬টি; এত দিন এগুলো ধর্মীয় গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত হয়নি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ওকলাহোমায় এক ফেডারেল জেলা বিচারক ‘স্থায়ী ইহুদি মূল্যবোধে ভিত্তি করে গঠিত’ করদাতা-অর্থায়িত একটি ইহুদি চার্টার স্কুল খোলার অনুমতি দিয়েছেন, যেখানে রাজ্য তহবিল থেকে ২৬ লাখ ডলার দেওয়া হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৮৩ লাখ ডলারে পৌঁছানোর কথা রয়েছে; স্কুলটির ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। এটি টিকে থাকবে ও বিস্তার লাভ করবে কি না, তা নির্ভর করছে কলোরাডো মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর।




