ডেট্রয়েট টেকনো সাউন্ডের পথিকৃৎ হুয়ান অ্যাটকিন্স মারা গেছেন, বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর

ডেট্রয়েট টেকনোর অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিশ্বজুড়ে ডান্স মিউজিকে গভীর প্রভাব ফেলা মার্কিন শিল্পী হুয়ান অ্যাটকিন্স মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। তিনি মডেল ৫০০ নামে একক শিল্পী হিসেবে এবং সাইবোট্রন জুটির অর্ধেক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর এজেন্সি গ্রিনস্মিথ আর্টিস্টস ডান্স মিউজিক বিষয়ক ওয়েবসাইট রেসিডেন্ট অ্যাডভাইজারকে খবরটি নিশ্চিত করেছে। এজেন্সি জানিয়েছে, মেক্সিকো সিটিতে একটি পরিবেশনার আগে হোটেল কক্ষে অ্যাটকিন্সকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
অ্যাটকিন্স এমন এক ঝলমলে, যান্ত্রিক ধাঁচের ইলেকট্রনিক সংগীত তৈরি করেছিলেন, যা প্রথমে সাইবোট্রন জুটির অংশ হিসেবে এবং পরে মডেল ৫০০ ছদ্মনামে তৈরি হয়। এই সংগীত একদিকে ডান্সফ্লোর মাতাতে পারত, আবার বিজ্ঞান-কল্পনার জগতের ছবিও ফুটিয়ে তুলত। তিনিই প্রথম এই কঠোর ইলেকট্রনিক ধারার সঙ্গে ‘টেকনো’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা পরে পুরো একটি ধারার নাম হয়ে ওঠে এবং আজ ডান্স সংস্কৃতির অন্যতম স্তম্ভ।
অ্যাটকিন্সের জন্ম ১৯৬২ সালে ডেট্রয়েটে। পরে পরিবারের সঙ্গে তিনি মিশিগানের গ্রামীণ শহরতলি বেলেভিলে চলে যান। ২০২৪ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছিলেন, হলুদ বাসে স্কুলে যাওয়া আর মাটির রাস্তায় থাকায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় ডেরিক মে ও কেভিন সন্ডারসনের সঙ্গে; জুনিয়র হাই স্কুলের এই দুই সহপাঠীর সঙ্গে মিলে তিনি গড়েন ‘বেলেভিল থ্রি’, ইলেকট্রনিক সংগীতের অগ্রভাগে থাকা এক ত্রয়ী।
তখনো হাই স্কুলে পড়ার সময়, রোল্যান্ড টিআর-৮০৮ ড্রাম মেশিন ও কর্গ এমএস-১০ সিন্থেসাইজারের মতো ক্রমশ সাশ্রয়ী হয়ে ওঠা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে রিচার্ড ডেভিসের সঙ্গে সাইবোট্রন গড়েন অ্যাটকিন্স। ২০১৪ সালে গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছিলেন, তাঁর একটি ক্লাস ছিল ‘ফিউচার স্টাডিজ’, যার বিষয় ছিল শিল্পসমাজ থেকে প্রযুক্তিসমাজে রূপান্তর; সেই ধারণাগুলোর অনেকটাই তিনি নিজের সংগীত তৈরিতে প্রয়োগ করেছিলেন।
ক্রাফটওয়ার্ক ও জিমি হেনড্রিক্স—দুয়ের প্রতিই সমান টান ছিল সাইবোট্রনের। তাঁদের ছন্দময় অথচ মনোবিভ্রমী ট্র্যাক ‘কসমিক কারস’ ও ‘ক্লিয়ার’ ডান্সফ্লোরের নিয়মিত সংগীত হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালে জুটিটি ভেঙে যায়; ডেভিস রক সংগীতের দিকে বেশি ঝুঁকেছিলেন। অ্যাটকিন্স পরে বলেছিলেন, ডেভিসের আগ্রহ ছিল অ্যালবামকেন্দ্রিক রক ঘরানার দিকে।
এরপর মডেল ৫০০ নামে একক পথচলায় অ্যাটকিন্স তৈরি করেন ‘নো ইউএফও’স’ ও ‘দ্য চেজ’-এর মতো ভিত্তি স্থাপনকারী ডান্স ট্র্যাক। ১৯৮৫ সালেই নিজের কাজ প্রকাশের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের রেকর্ড লেবেল মেট্রোপ্লেক্স। পরের বছরগুলোতে এই লেবেল থেকে অ্যান্থনি শাকির ও ডিজে বোনসহ আরও শিল্পীদের কাজ প্রকাশিত হয়।
১৯৮০-র দশকজুড়ে এবং তার পরেও অ্যাটকিন্সের সংগীতে শুধু প্রযুক্তি-উটোপীয় স্বপ্ন নয়, আরও উদ্বেগজনক ও রাজনৈতিক ভাবনাও জায়গা পেয়েছে। ২০২৪ সালে গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সামাজিক বক্তব্য দিই। আমার গানের কথা এমন হওয়ার কথা, যা ডান্সফ্লোরে নাচ আর প্রেমে পড়ার বাইরেও অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে।’
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে তাঁর হাতে অনুপ্রাণিত টেকনো ধারাটি ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর দশকের শেষভাগে দ্রুতগতির প্রকল্প ‘ইনফিনিটি’ দিয়ে তিনি নিজের সাউন্ডকে আরও পরিশীলিত করেন।
২০০০-এর দশকে তাঁর নতুন প্রকাশনা তুলনামূলক কম ছিল, তবে আরেক টেকনো কিংবদন্তি মরিৎজ ফন অসওয়াল্ডের সঙ্গে ‘বর্ডারল্যান্ড’ জুটি গড়ে তিনি ২০১৩ ও ২০১৬ সালে দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন।
২০২৩ সালে অ্যাটকিন্স সাইবোট্রনকে আবার গড়ে তোলেন; নতুন সংগীত প্রকাশ ও সরাসরি পরিবেশনা শুরু হয়। ততদিনে তাঁর প্রভাব টেকনোর গণ্ডি ছাড়িয়ে বহু দূর ছড়িয়ে পড়েছিল—শুধু ‘ক্লিয়ার’ ট্র্যাকটিই ডজনখানেক শিল্পী নিজেদের কাজে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মিসি এলিয়ট সেটিকে তাঁর ‘লুজ কন্ট্রোল’ গানের ভিত্তি করেছিলেন, যা ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড চার্টে ৩ নম্বরে পৌঁছেছিল।
রোববার অ্যাটকিন্সকে শ্রদ্ধা জানানোদের মধ্যে ছিলেন কেভিন সন্ডারসন। তিনি তাঁকে ‘সত্যিকারের দূরদর্শী, যিনি আমাদের অনেকের জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন, আমি নিজেও যার মধ্যে আছি’ বলে অভিহিত করেন।




