…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › লাইফস্টাইল › খবর
লাইফস্টাইল

কুড়িগ্রামের সিংহীমারী: যে গ্রামে অর্ধশত শিশু বিনা মূল্যে শিখছে লোকসংগীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
কুড়িগ্রামের সিংহীমারী: যে গ্রামে অর্ধশত শিশু বিনা মূল্যে শিখছে লোকসংগীত
ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের ছিনাই বাজার থেকে নেমে যাওয়া সড়ক ধরে এগোলেই সবুজে ঘেরা সিংহীমারী গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই শিশুদের কণ্ঠে ভেসে আসে লালনের বিখ্যাত গান ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

সুর অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে একটি বাড়ির আঙিনায় দেখা মেলে লোকসংগীতের আসরের—অর্ধশত শিশু বসেছে লোকবাদ্যযন্ত্রের তালে গান শিখতে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যেরবাজার সিংহীমারী গ্রামটি এভাবেই লোকসংগীতের গ্রাম হয়ে উঠেছে। গ্রামের সংগীতজ্ঞ নারায়ণ চন্দ্র রায়ের বাড়িতেই মূল আয়োজন; তিনি লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষক ও প্রধান গুরু, তাই তাঁর বাড়ি ‘সেবালয় গুরুগৃহ’ নামে পরিচিত।

সেবালয়ে প্রতি শুক্র ও শনিবার শিশু-কিশোরদের বিনা মূল্যে লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্র শেখানো হয়। হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতিকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে এক দশক ধরে চলছে এই আয়োজন।

গুরুগৃহে গুরুদের সামনে দোতারা, একতারা, বাঁশি কিংবা তবলা নিয়ে বসে শিশুরা। একদিকে চলে সুরের তালিম, অন্যদিকে লোকগানের অনুশীলন; ভুল করলে গুরুর নির্দেশনায় আবার নতুন করে সুর ধরার চেষ্টা করে তারা।

প্রশিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র রায় জানান, শুধু সেবালয় নয়—‘মায়ের তরী’ নামের একটি সংগঠন কুড়িগ্রামে চারটি ও লালমনিরহাটে পাঁচটি গুরুগৃহ পরিচালনা করছে। নয়টি গুরুগৃহের প্রতিটিতেই বিনা মূল্যে লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা চলে এবং প্রতিটির সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী ও প্রশিক্ষক যুক্ত রয়েছেন।

নারায়ণ চন্দ্র রায় মনে করেন, লোকবাদ্যযন্ত্র শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এগুলো একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের ধারক। তাঁর তত্ত্বাবধানে শিশুরা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর পাশাপাশি সুরের প্রতি ভালোবাসা ও চর্চার শৃঙ্খলাও শিখছে।

মায়ের তরীর যাত্রা শুরু এক ভিনদেশি নারীর এ দেশের লোকসংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধতা থেকে। সংগঠনটির অন্যতম সংগঠক সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী ইউসুফ আলমগীর জানান, নরওয়ের নাগরিক কবি, লেখক, লোকগবেষক ও আলোকচিত্রী উয়েয়া সেথ ১৯৯৮ সালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে যান; সেখানকার নারীদের কণ্ঠে মরমি গান তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। পরে তিনি লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করেন এবং ২০১৬ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠে মায়ের তরী।

সেবালয় গুরুগৃহের শিক্ষার্থী সাথী রায় বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে এখানে গানের পাশাপাশি যন্ত্র বাজানো শিখছি। আমরা শিখে অন্যদের শেখাতে চাই।’ এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আদুরি রায় বলেন, প্রত্যন্ত এই গ্রামের সেবালয়ে তাঁর মেয়ে ও ছেলে গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখায় তিনি গর্বিত।

এই লালন ও বিস্তারের কাজ চলে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে। সেবালয়ের গুরু নিমাই চন্দ্র ও নির্মল চন্দ্রের মতে, লোকসংগীতের চর্চা শুধু গান শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে শিশুদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব।

তবে অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ ও মেরামত, প্রশিক্ষকদের সম্মানী, যাতায়াত ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থ প্রয়োজন; অর্থের অভাবে কখনো কখনো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে বলে সংগঠকেরা জানান।

মায়ের তরীর নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, নয়টি গুরুগৃহকে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব; প্রয়োজন স্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, বাদ্যযন্ত্র, প্রশিক্ষকদের সম্মানী ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। তিনি চান, কার্যক্রমটি কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ুক।

সংগঠকদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রবীণ লোকশিল্পী, বাউল, ভাওয়াইয়াশিল্পী ও বাদ্যযন্ত্রীদের জন্য একটি ‘আনন্দ আশ্রম’, উত্তরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকগান ও শিল্পীদের কণ্ঠ সংরক্ষণে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ লোকসংগীত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।

ইউসুফ আলমগীর মনে করেন, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু শিল্পী বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, লোকসংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা অঞ্চলের একক সম্পদ নয় এবং একে শুধু উৎসব বা বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়।

লাইফস্টাইল বিভাগের আরও খবর

পটুয়াখালীতে চায়ের দোকানে পাঠাগার গড়লেন ইমন, তিন শতাধিক বই নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
লাইফস্টাইল

পটুয়াখালীতে চায়ের দোকানে পাঠাগার গড়লেন ইমন, তিন শতাধিক বই নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

এক হাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে বই — পটুয়াখালীতে এমন দৃশ্যই এখন দেখা যাচ্ছে একটি চায়ের দোকানে। তরুণদের মাদক ও মোবাইল ফোনের আসক্তি কমিয়ে বই পড়ার অভ্য…

মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫০০ বছরের স্মৃতি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মসজিদ
লাইফস্টাইল

মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫০০ বছরের স্মৃতি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মসজিদ

বাংলার ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে সুলতানি আমলের অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন। কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মসজিদ, কোথাও আবার কালের সাক্ষী হয়ে…