ফ্লোরিডায় বিধ্বস্ত জেটের ককপিটে শেষ মুহূর্তের আতঙ্কের রেকর্ডিং, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ৬০০ বাসিন্দাকে

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বিধ্বস্ত লিয়ারজেট ৬০ বিজনেস জেটটির ককপিটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের রেকর্ডিং সামনে এসেছে, যেখানে দ্রুত উচ্চতা হারানোর কথা বলার পর আতঙ্কিত কণ্ঠে বলা হয়, উড়োজাহাজটি মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছের একটি ট্রেলার পার্ক এলাকার প্রায় ৬০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে পাম বিচ কাউন্টির ক্রেস্টহেভেন এলাকার কাছে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। টেক্সাসের অস্টিন থেকে বাহামার উদ্দেশে যাত্রা করা উড়োজাহাজটির ৯ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনাস্থল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবকাশযাপন কেন্দ্র মার-আ-লাগো থেকে প্রায় ৯ মাইল বা ১৪ কিলোমিটার দূরে।
লাইভএটিসি ডট নেটের কাছে সংরক্ষিত ককপিট রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, পাইলট প্রথমে বরফ জমা নিয়ে ‘সামলানো যায় এমন’ সমস্যার কথা বলছিলেন। পরে তিনি বলেন, উড়োজাহাজটি দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর আতঙ্কিত ক্রুরা বলেন, ‘আমরা মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) বিবৃতিতে জানিয়েছে, লিয়ারজেট ৬০ মডেলের উড়োজাহাজটি অস্টিন থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, গন্তব্য ছিল বাহামা। অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিশ্চিত করেছে, এটি একটি ব্যক্তিগত জেট ছিল, তবে আরোহীদের পরিচয় জানায়নি। উড়োজাহাজটির গতিপথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এটি প্রতি সেকেন্ডে কয়েক শ ফুট করে নিচে নামছিল।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে উড়োজাহাজটিকে প্রচণ্ড গতিতে ও খাড়া কোণে মাটিতে আছড়ে পড়তে এবং তারপর বিশাল বিস্ফোরণ ঘটতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ড্যাশবোর্ড ক্যামেরার ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পরের ফুটেজে ধ্বংসাবশেষের আশপাশে আগুনের শিখা ও ভাঙা ফুটপাতের টুকরা ছড়িয়ে থাকতে এবং এলাকায় মানুষের জটলা দেখা গেছে।
দুর্ঘটনাস্থলের ছবিতে আবাসিক এলাকার একটি সড়কে বড় গর্ত দেখা গেছে, চারদিকে আগুনের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। উড়োজাহাজটির ভাঙা অংশ, কংক্রিটের টুকরা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পাম বিচ কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে মিলিটারি ট্রেইল নামের ছয় লেনের একটি সড়কে, যার দুই পাশে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও খাবারের দোকান রয়েছে। উড়োজাহাজটি বাড়ি ও গাড়ির মাত্র কয়েক মিটার দূরে আছড়ে পড়ে।
ঘটনাস্থল থেকে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস সাংবাদিকদের বলেন, এ পর্যন্ত মাটিতে থাকা কারও হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনাটিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, উড়োজাহাজটি ‘দেখতে যেন একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিচে নেমে আসছিল, আর সড়কের পাশে বড় একটি গর্ত তৈরি করে গেছে।’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘ভিডিওটি দেখলে গা শিউরে ওঠে। মনে হয়, যেন একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিচে নেমে আসছে। এরপর বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে, চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি রোববার এক্সে দেওয়া পোস্টে দুর্ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ ও ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, তদন্তে ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডকে (এনটিএসবি) সহায়তা করতে এফএএর কর্মীরা ঘটনাস্থলের পথে রয়েছেন। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের জন্য সবাইকে প্রার্থনা করার আহ্বানও জানান তিনি।
পাম বিচ কাউন্টির অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বিভাগ ঘটনাটিকে ‘বিপুলসংখ্যক হতাহতের ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। উড়োজাহাজটিতে কারা ছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি বলে গভর্নর ডিস্যান্টিস জানিয়েছেন।
গভর্নর ডিস্যান্টিস ও স্থানীয় কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুর্ঘটনাস্থলের কাছের একটি ট্রেলার পার্ক এলাকার প্রায় ৬০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ায় এলাকার অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে পানি সরবরাহের পাইপলাইনও রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি আবার চালু করতে অন্তত ৩০ দিন লাগতে পারে।
দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় ঝড় হচ্ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে, আর সংবাদ সম্মেলনের সময়ও সেখানে ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল।
রোববার সকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার-আ-লাগোতে ছিলেন। দুর্ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা আগে কাছের একটি বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে তিনি সেখান থেকে রওনা হন।



