পল্লবীর রামিসা হত্যা মামলায় ২৮ দিনে রায়, অথচ দেশে ঝুলে আছে ৪০ লাখের বেশি মামলা

রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা মামলার বিচার শেষ করে মাত্র ২৮ দিনে রায় ঘোষণা হয়েছে। একই ধরনের অসংখ্য হত্যা মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকায় এই দ্রুত রায় নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন বা অমীমাংসিত মামলার সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে প্রায় তিন লাখ মামলা রয়েছে। সম্প্রতি এই তথ্য জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
আইনজীবীদের মতে, ফৌজদারি মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলে বিলম্ব, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আদালতে মামলার অতিরিক্ত চাপ, বিচারক ও বেঞ্চের সীমাবদ্ধতা এবং অধস্তন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে নথি পাঠানোর জটিলতা মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আদনান ইয়াজদানী বলেন, একটি মামলায় দ্রুত রায় সম্ভব হয়েছে বলেই সব হত্যা মামলার বিচার একই সময়ে শেষ করা সম্ভব, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ কম। মামলার ঘটনা, আসামির সংখ্যা, সাক্ষীর সংখ্যা, সাক্ষ্য-প্রমাণের ধরন, তদন্তের জটিলতা এবং আসামিপক্ষের আইনগত আবেদনের ওপর বিচারের সময় নির্ভর করে।
তিনি বলেন, এই উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: যথাযথ প্রস্তুতি, সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর আদালত ব্যবস্থাপনা থাকলে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানো সম্ভব। তবে দ্রুত বিচার মানে শুধু দ্রুত রায় নয়; সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও ন্যায়বিচারের সব শর্ত বজায় রেখেই নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ফৌজদারি মামলাগুলোতে প্রসিকিউশনের গাফিলতি চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত সময়ে সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হওয়া, সাক্ষী হাজির হলেও সেদিন জবানবন্দি গ্রহণ না করা এবং আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও একাধিক তারিখে সাক্ষীর অনুপস্থিতি মামলার কার্যক্রম পিছিয়ে দেয়।
তার মতে, সাক্ষ্যগ্রহণে সবচেয়ে বেশি সময় যায়। বিচ্ছিন্নভাবে একের পর এক তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী একটানা দুই-তিন দিন সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আদালতের কার্যতালিকা ও সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি বিবেচনায় ‘ব্লক ডেট’ নির্ধারণ করা হলে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
বিচার শুরুর আগেই তদন্ত পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের সুযোগ তৈরি হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ, সন্দেহভাজন শনাক্তকরণ শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হয়; কোনো ধাপে বিলম্ব হলে বিচারও পিছিয়ে যায়। তবে দ্রুত অভিযোগপত্রের লক্ষ্য যেন তদন্তের মান ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অধস্তন আদালতে বিচার শেষ হওয়ার পর উচ্চ আদালতে এলে নতুন করে অপেক্ষা শুরু হতে পারে। মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, অনেক সময় অধস্তন আদালতের মামলার যাবতীয় নথি (এলসিআর) সময়মতো উচ্চ আদালতে পৌঁছায় না, নিয়মিত তাগাদা বা রিমাইন্ডারের অভাবও বিলম্বের কারণ হতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফিকুস ছালেকীন বলেন, মামলার তুলনায় বিচারক ও বেঞ্চের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে প্রতিটি মামলার জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ে।
মোতাহার হোসেন সাজুর মতে, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন জরুরি; আইন মন্ত্রণালয়ের কার্যকর মনিটরিং ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের ভূমিকা প্রয়োজন। উচ্চ আদালতে বিচারপতির সংখ্যা ও বেঞ্চ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারক নিয়োগ দেওয়া গেলে দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।




