আজ কমন্সে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বসবাসের নতুন নিয়মের ঘোষণা: অপেক্ষা ১০ থেকে ১৫ বছর, উদ্বেগে হাজারো বাংলাদেশি

যুক্তরাজ্যে বৈধ অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময়সীমা বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ বছর করার এক ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। সোমবার (২ নভেম্বর) স্থানীয় সময় বিকালে ওয়েস্টমিনস্টারের হাউস অব কমন্সে তিনি সরকারের এই চূড়ান্ত নীতিমালা উপস্থাপন করবেন।
হোম অফিসের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রায় এক বছরব্যাপী গণপরামর্শে জমা পড়া দুই লাখেরও বেশি মতামত পর্যালোচনার পর আজ পার্লামেন্টে সরকারের এই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে। পার্লামেন্টে বিবৃতির পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গেও বৈঠক করছেন, যাদের অনেকেই এই পরিবর্তন নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নতুন নিয়মে স্থায়ী হওয়ার সাধারণ সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে দ্বিগুণ করে ১০ বছর এবং স্নাতক পর্যায়ের নিচের পেশাগুলোর ক্ষেত্রে তা তিনগুণ বাড়িয়ে ১৫ বছর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে ব্রিটেনে বর্তমানে কর্মরত বিদেশি সোশ্যাল কেয়ার কর্মীদের এই কঠোর নিয়ম থেকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে বেশি আয় এবং স্থানীয় কমিউনিটিতে অবদানের ভিত্তিতে পয়েন্ট-ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অপেক্ষার সময় কমানোর একটি নতুন পদ্ধতিও চালু করা হচ্ছে। যদিও দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এ কর্মী সংকট এবং দ্বিতীয় ‘উইন্ডরাশ’ কেলেঙ্কারির ঝুঁকি নিয়ে ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্লেষক ও এমপিরা।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও হতাশায় পড়েছেন গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে কেয়ার ভিসা এবং স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় আসা হাজার হাজার নতুন অভিবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাবেন— এমন আইনি প্রত্যাশা নিয়েই এসব বাংলাদেশি কর্মী বিপুল অর্থ ব্যয় করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০২১ ও ২০২২ সালে যারা স্কিলড ওয়ার্কার ও স্পাউস ভিসায় এসেছেন এবং যাদের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র ১২ মাসের কম সময় বাকি রয়েছে, তারা এখন আর্থিক ও আইনি ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা ছাড়া ১০ বছরের এই নিয়ম কার্যকর হলে, চার সদস্যের একটি অভিবাসী পরিবারকে স্থায়ী হওয়ার বদলে আরও দুই দফা ভিসা নবায়ন ও ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড গুণতে হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৮ লাখ টাকার বেশি।
এ ছাড়া ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হোম অফিসের অভিযানে যেসব প্রতিষ্ঠানের স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে নতুন স্পনসর খুঁজে পাওয়ার চাপে রয়েছেন। ১০ বছরের নতুন নিয়ম চালু হলে স্পনসর হারানোর এই ঝুঁকি দ্বিগুণ হবে এবং স্টুডেন্ট বা গ্র্যাজুয়েট ভিসা থেকে স্কিলড ওয়ার্কারে আসা তরুণ বাংলাদেশিদের স্থায়ী হতে মোট ১৬ বছর পর্যন্ত অস্থায়ী ভিসায় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ঘোষণার আগে গত ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইভেট কুপারের কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দলের এমপি, স্বাস্থ্যখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অভিবাসী ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগঠনের নেতারা। চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই সংস্কার ‘উইন্ডরাশ’ যুগের বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন লেবার পার্টির এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি, ডায়ান অ্যাবট, ক্লাইভ লুইস ও র্যাচেল মাসকেল এবং গ্রিন পার্টির এমপি এলিটা চনস, কার্লা ডেনিয়ার, সিয়ান বেরি ও হান্না স্পেন্সার। এ ছাড়া কেয়ার ইংল্যান্ড, সোসাইটি অব রেডিওগ্রাফার্স, ওয়ার্ক রাইটস সেন্টার এবং অ্যাকশন ফর রেস ইকুয়ালিটি চিঠিতে সমর্থন দিয়েছে।
চিঠিতে মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধে এই প্রস্তাব বাতিল করা হয় অথবা কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। ২০১৭ সালে ফাঁস হওয়া উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারিতে দেখা গিয়েছিল, ব্রিটেনে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার থাকা সত্ত্বেও মূলত কৃষ্ণাঙ্গ ও কমনওয়েলথভুক্ত নাগরিকদের অন্যায়ভাবে আটক, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং কাজ ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য ও সোশ্যাল কেয়ার খাতের নেতারা সতর্ক করেছেন, যারা পাঁচ বছরের নিয়মের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন, মাঝপথে তাদের নিয়ম বদলে দেওয়া অন্যায্য। গত পাঁচ বছরে হোম অফিস প্রায় ২ লাখ হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা দিয়েছে, যাদের সঙ্গে আরও কয়েক লাখ পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে এসেছেন। চিকিৎসা খাতের নেতারা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য ও কেয়ার খাত ইতোমধ্যেই কর্মী সংকটে ভুগছে; আন্তর্জাতিক কর্মীদের ধরে রাখতে না পারলে— বিশেষ করে রেডিওগ্রাফির মতো বিভাগে— এনএইচএসের দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা কমানো এবং ক্যানসার চিকিৎসার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বৈধ অভিবাসীরা উচ্চ আয় বা স্থানীয় সমাজে অবদানের মাধ্যমে পয়েন্ট অর্জন করে ১০ থেকে ১৫ বছরের সময়সীমা কমিয়ে আনতে পারবেন। এই পরিকল্পনা সম্পর্কে শাবানা মাহমুদ বলেন, ব্রিটেন একটি বহু-ধর্ম ও বহু-জাতির গণতন্ত্র, যেখানে অবদান ও সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়া অপরিহার্য; তাই এ দেশে স্থায়ী হওয়া কোনো জন্মগত অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুযোগ যা অর্জন করে নিতে হবে।
তবে এই নীতি নিয়ে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গত জুনে আবাসন মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার বর্তমানে কর্মরত কেয়ার কর্মীদের ওপর ১৫ বছরের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়াকে ‘অ-ব্রিটিশ’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। সেপ্টেম্বরে তৎকালীন জ্বালানি মন্ত্রী মিয়াট্টা ফাহনবুল্লেহ এই প্রস্তাবে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, শরণার্থী হিসেবে ব্রিটেনে আসা তার নিজের পরিবারের জন্যও এমন নিয়ম অত্যন্ত কঠিন হতো।
অন্যদিকে বর্তমানে কর্মরত কেয়ার কর্মীদের ছাড় দেওয়ার খবরের সমালোচনা করেছে বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ও রিফর্ম ইউকে। কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেছেন, শাবানা মাহমুদ অ্যাঞ্জেলা রেইনার ও বামপন্থি লেবার এমপিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইউ-টার্ন নিয়েছেন। ফিলপ জানান, কনজারভেটিভ পার্টি শুধুমাত্র উচ্চ আয়ের কর্মীদের জন্য ১০ বছরের আইএলআর নিয়ম চায়। রিফর্ম ইউকে-র ট্রেজারি মুখপাত্র রবার্ট জেনরিকও এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন।
এখন সবার দৃষ্টি আজ বিকালে হাউস অব কমন্সে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির দিকে, যেখানে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির সময়সীমার আগে যুক্তরাজ্যে থাকা প্রায় ১৬ লাখ বৈধ অভিবাসীর ভবিষ্যৎ এবং সম্ভাব্য হাইকোর্ট জুডিশিয়াল রিভিউ এড়াতে সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষার চূড়ান্ত রূপরেখা স্পষ্ট হবে।



