মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রেকর্ড স্বতন্ত্র ভোটার, তবু দুই দলের বাইরে জয় কঠিন
যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবারের বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন আমেরিকানরা। রেকর্ডসংখ্যক ভোটার নিজেদের স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, আর এই ভোটাররাই মার্কিন কংগ্রেস ও রাজ্য আইনসভাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেন।
প্রায় অর্ধেক মার্কিন ভোটার — ১১ কোটি ৭০ লাখ পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ — এখন নিজেদের রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান — দুই প্রধান দলই তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
একই সময়ে স্বতন্ত্র বা তৃতীয় পক্ষের প্রার্থীরা ফেডারেল বা রাজ্য পর্যায়ের আসনে খুব কমই জেতেন। রাজ্য আইনসভা থেকে মার্কিন কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্ট পদ পর্যন্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মার্কিন রাজনীতিতে আধিপত্য ধরে রেখেছে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দল।
মেইন অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান দলীয় সভাপতি রিক বেনেট — যিনি রাজ্যটির ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় স্বতন্ত্র গভর্নর হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন — বলেন, ‘পুরো (নির্বাচনী) ব্যবস্থাটাই ভোটারদের স্বাধীনতাকে হতাশ করার জন্য তৈরি।’
বেনেটের প্রার্থিতা মার্কিন রাজনীতির সবচেয়ে স্থায়ী একটি বৈপরীত্যের মুখোমুখি: লাখ লাখ যোগ্য ভোটার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট পরিচয় প্রত্যাখ্যান করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেবেন তাঁদের তুলনায় অনেক কম মানুষ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ জে সিমন্স বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দলের বাইরের প্রার্থীরা (উচ্চ) মাত্রার সমর্থন পেতে সংগ্রাম করেছেন। (তবে) ২০২৬ সাম্প্রতিক স্মৃতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী চক্রগুলোর একটি হয়ে উঠছে।’
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বার্ষিক ন্যাশনাল পাবলিক ওপিনিয়ন রেফারেন্স সার্ভে অনুযায়ী, মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কদের ৪৪ শতাংশ নিজেদের রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেন। এর বিপরীতে ২৯ শতাংশ নিজেদের ডেমোক্র্যাট এবং ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দেন।
তবে একটি সতর্কতা রয়েছে: নিজেদের স্বতন্ত্র বলা বেশিরভাগ মানুষই শেষ পর্যন্ত প্রধান দুই দলের কোনো একটির দিকেই ঝুঁকেন। যেসব স্বতন্ত্র ভোটার কোনো দলের দিকেই একেবারেই ঝোঁক প্রকাশ করেন না, তাঁরা মোট ভোটারের মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ। এই ‘প্রকৃত’ স্বতন্ত্র ভোটারদেরই প্রার্থীরা খোঁজেন, কারণ তাঁরা মত বদলাতে পারেন — গভীরভাবে বিভক্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট ভোটার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাঁরাই আকাঙ্ক্ষিত সুইং ভোটের কেন্দ্র।
জরিপ সংস্থা ম্যারিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র ভোটারদের ৫২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন, আর ৩৯ শতাংশ রিপাবলিকানদের পক্ষে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি হতাশা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ছড়িয়ে পড়েছে: স্বতন্ত্র উত্তরদাতারা তাঁদের ভোট মূলত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে — এমন বলার সম্ভাবনা তিন গুণের বেশি, আর ২৮ শতাংশ বলছেন তাঁরা ‘পরিবর্তনের’ জন্য ভোট দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আইনত নির্বাচন দুই দলে সীমাবদ্ধ নয় এবং অনেক স্থানীয় কর্মকর্তা কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। কিন্তু মঙ্গলবারের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট নির্বাচনের মতো আরও ক্ষমতাশালী ফেডারেল ও রাজ্যব্যাপী আসনের ক্ষেত্রে ‘বিজয়ী সব নেয়’ নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং একক সদস্যের কংগ্রেসীয় আসন বাইরের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং ভোটারদের তাঁদের সমর্থন করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এমনকি একটি ছোট দলের প্রতি ব্যাপক সমর্থনও কোনো একটি আসনে জেতার মতো করে একটি জেলায় কেন্দ্রীভূত হয় না বললেই চলে।
ভোটাররাও অজান্তে এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেন। জরিপের প্রবণতা ও তথ্য আরও বলছে, যেসব ভোটার নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেন বা স্বতন্ত্র প্রার্থী পছন্দ করেন, তাঁরা প্রায়ই শেষ পর্যন্ত এমন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকেই সমর্থন করেন, যাঁকে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে বেশি সম্ভাবনাময় মনে করেন। ভোটাররা ‘স্পয়লার’ প্রার্থীদের সমর্থন করতেও অনিচ্ছুক — যাঁরা প্রধান দুই দলের কোনো এক প্রার্থীর ভোট কেটে নিতে পারেন।
তৃতীয় পক্ষ নিয়ে গবেষণা করা ভালদোস্তা স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বার্নার্ড তামাস বলেন, তৃতীয় পক্ষের প্রার্থীদের ব্যালটে ওঠা ঠেকানোর জন্য প্রায়ই আইনকে দায়ী করা হলেও ‘আইনি বাধা এসব প্রার্থীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে — এমন প্রমাণ খুব কমই আছে।’
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী চক্রে ফেডারেল নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তা ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে — শুধু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই ব্যয় পৌঁছাতে পারে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত। ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী প্রচার চক্রে প্রায় ২৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে, আর রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি (আরএনসি) সংগ্রহ করেছে প্রায় ৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
তামাস বলেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘কার্যত কোনো সরকারি সহায়তা’ বা তহবিল দেয় না এবং প্রচার ব্যয়ে কোনো সীমাও বেঁধে দেয় না। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘খুব কম অর্থ সংগ্রহ করেন’ এবং ভোটারদের কাছে কম পরিচিত থাকেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ লেসলি শেড বলেন, নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া ভোটারদের এই উত্থান প্রধান দুই দলের কোনো একটির প্রতি তাঁদের সমর্থনকে আড়াল করে। তিনি বলেন, ‘কেউ যখন বলেন তিনি স্বতন্ত্র, আসলে তিনি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটই — তবে হয়তো প্রতিটি বিষয়ে দলের সঙ্গে একমত নন। অথবা (তিনি শুধু) ওয়াশিংটন ডিসির জলাভূমির সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নিজেকে দেখতে চান না।’
সিমন্সের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আসল পরীক্ষা হলো আমেরিকানদের বোঝানো, যেন তাঁরা শুধু ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ ভোট’ না দিয়ে তাঁদের পক্ষে ভোট দেন। সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রার্থীরা ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান হওয়ায় ভোটাররা ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া ব্যালট দিতে অনিচ্ছুক।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনে উদ্যোগও রয়েছে। সাবেক ডেমোক্র্যাট থেকে স্বতন্ত্র হওয়া সিনেটর জো মানচিনের উদ্যোগে জুলাইয়ে চালু হওয়া ইন্ডিপেনডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিল স্বতন্ত্র কংগ্রেস প্রার্থীদের দাতা ও প্রচার সম্পদ জোগান দেয়। প্রকল্পটি ১ কোটি ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা হলো স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একাধিক আসন ও নির্বাচনী চক্রজুড়ে সম্ভাবনাময় থাকতে পারেন কি না। বর্তমানে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং সিনেটে দুজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। কোনো রাজ্যের গভর্নর পদে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই।
বেনেট সেই ১১ জন স্বতন্ত্র বা তৃতীয় পক্ষের প্রার্থীর একজন, যাঁরা গভর্নর বা মার্কিন সিনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং যাঁদের সম্পর্কে সিমন্স মনে করেন তাঁরা নির্বাচনী সম্ভাবনা মাপার জন্য প্রায়ই ব্যবহৃত ৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করবেন।
এ ছাড়া সিমন্স মনে করেন, স্বতন্ত্র কংগ্রেস প্রার্থীরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মানচিত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারেন এমন কয়েকটি উপায় রয়েছে — প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে: নেব্রাস্কা ও মন্টানা। তিনি নেব্রাস্কার স্বতন্ত্র সিনেট প্রার্থী ড্যান অসবর্নকে — ৫১ বছর বয়সী নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য — সারা দেশে ‘জয়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ নির্বাচন বিশ্লেষণ ওয়েবসাইট রিয়েলক্লিয়ারপোলিং ওই আসনের প্রতিযোগিতাকে সমানে সমান বলে অভিহিত করেছে। নেব্রাস্কা ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাদের প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর বিকল্প মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রিপাবলিকান পিট রিকেটসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়ে গেছেন অসবর্ন।
মন্টানায় সিমন্স আরেকটি সুযোগ দেখছেন, যদিও একটি অপ্রত্যাশিত ‘স্পয়লার’ প্রভাবের সম্ভাবনায় ওই প্রতিযোগিতা জটিল হয়ে উঠেছে। মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য সেথ বডনার মার্কিন সিনেট আসনে রিপাবলিকান কার্ট আলমের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁকে সমর্থন করছে ইন্ডিপেনডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিল, যারা ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য কেভিন কাইলিকেও সমর্থন করছে — তিনি রিপাবলিকান দল ছেড়ে স্বতন্ত্র হিসেবে পুনর্নির্বাচন চাইছেন। ডেমোক্র্যাটিক মার্কিন সিনেট প্রার্থী আলানি ব্যাংকহেড বডনারের কেন্দ্র-বাম ও রিপাবলিকানবিরোধী ভোটারদের একই অংশ থেকে সমর্থন কেড়ে নিতে পারেন, যাতে ত্রিমুখী ভোট বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রার্থীই সুবিধা পেতে পারেন। সিমন্স বলেন, ‘মন্টানা দ্বিতীয় সবচেয়ে সম্ভাবনাময়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তা ঘটলে রিপাবলিকান দলের জন্য রাতটি হবে অসাধারণভাবে খারাপ।’
আইডাহো ও সাউথ ডাকোটায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতবেন বলে পূর্বাভাস নেই, তবে রিপাবলিকানরা ওই আসনগুলোকে নিরাপদ মনে করায় তাঁরা রিপাবলিকানদের মূল্য দিতে বাধ্য করবেন বলে আশা করা হচ্ছে — অর্থ, প্রচারের সময় ও মনোযোগ এমন প্রতিযোগিতায় সরিয়ে নিয়ে, যেগুলোকে রিপাবলিকানরা অন্যথায় নিশ্চিত মনে করত। সিমন্সের মতে, স্বতন্ত্রদের সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে প্রধান দলগুলোর ওপর ঐতিহাসিকভাবে তাঁরা যে চাপ তৈরি করেছেন — ‘নতুন নীতি বাস্তবায়ন করা বা আরও কার্যকরভাবে শাসন করা’র জন্য।

