নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী ব্লকের সঙ্গে হাত মেলাতে প্রস্তুত আরব জোট, বললেন ইউসুফ জাবারিন

ইসরায়েলের প্রধান ফিলিস্তিনি জোটের নেতা বলেছেন, দেশটির সামনে দিক বদলের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক আসন জেতার পর ক্ষমতার ভারসাম্য এখন এই জোটের হাতে, আর তার নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী ব্লকের সঙ্গে হাত মেলাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ইউসুফ জাবারিন বলেছেন, নেতানিয়াহু ও তার উগ্র-ডান জোটকে হটিয়ে নেসেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে তিনি 'চেঞ্জ' ব্লকের সঙ্গে যোগ দিতে প্রস্তুত।
আরব ইসরায়েলিদের — ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিদের, যারা জনসংখ্যার ২০ শতাংশ — ভোটার উপস্থিতি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা রাজনৈতিক চিত্রই বদলে দিয়েছে। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের এই নির্বাচনে ভোটাধিকার ছিল না।
জাবারিন বলেছেন, প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি ভোটারের প্রথম দাবি হলো নেতানিয়াহু সরকারকে বিদায় করা, বিশেষ করে এর সবচেয়ে চরমপন্থী সদস্যদের — জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচকে সরানো।
নির্বাচনের পর দেওয়া প্রথম দিকের সাক্ষাৎকারগুলোর একটিতে জাবারিন বলেন, 'জীবনের সব ক্ষেত্রে এই চার বছর ছিল ভয়াবহ: বাড়ি ধ্বংস, পুলিশের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য; আমাদের পৌরসভা, শিক্ষা ও তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ না দেওয়া; জীবনের সব ক্ষেত্রে বর্ণবাদ — আরবদের ওপর শারীরিক হামলা, পুলিশের নিষ্ঠুরতা। সত্যিই এটি ছিল খুবই বিপজ্জনক এক সময়।'
তিনি বলেছেন, আগামী কয়েক দিন হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগ বুধবারের মধ্যেই রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে পরামর্শ নিতে পারেন — কাকে প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে। কোনো একক গোষ্ঠীরই ক্ষমতার ওপর স্পষ্ট দাবি নেই।
১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ৬৮ আসন থেকে নেমে এসেছে ৫৩ আসনে। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জায়নবাদী দলগুলোর চেঞ্জ ব্লকের আসন ৪৮টি। ফলে রেকর্ড ১৯ আসন নিয়ে আরব-ইসরায়েলি দলগুলো এখন সম্ভাব্য 'কিংমেকার'। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্টের ১১টি ও অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাআমের ৮টি আসন রয়েছে।
আইজেনকোট ও তার মিত্ররা নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠন না করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের ক্ষেত্রে আইজেনকোট শর্তও দিয়েছেন: তাদের ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতে হবে, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা মেনে নিতে হবে এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিন্দা করতে হবে।
রাআম ও এর নেতা মানসুর আব্বাস আইজেনকোটের জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। জয়েন্ট লিস্টের এমন সরকারে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা নেই, তবে জাবারিন বলেছেন, বাইরে থেকে কৌশলগত ভোট দিয়ে সরকারটিকে টিকিয়ে রাখতে তার জোট প্রস্তুত।
উত্তরের শহর উম্ম আল-ফাহমে নিজের পারিবারিক বাড়িতে জাবারিন বলেন, 'আইজেনকোট যে শর্তগুলোর কথা বলেন, সেগুলো জোটে থাকা দলগুলোর জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা জোটে থাকার পরিকল্পনা করছি না, খুব স্পষ্ট কারণে। যত দিন পশ্চিম তীরে আমাদের জনগণের ওপর দখলদারিত্ব চলবে, আমরা কোনো সরকারের অংশ হতে পারি না। তবে চরমপন্থী নেতানিয়াহু সরকারকে সরাতে আমাদের রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারের জন্য আমরা বাইরে থেকে সমর্থনের সম্ভাবনা বিবেচনা করব বলেছি। এটি নীতি বদলের, মনোভাব বদলের সুযোগ — আরব সম্প্রদায়ের প্রতি এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিও। এটি সত্যিই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।'
৫৪ বছর বয়সী জাবারিন সাবেক আইনের অধ্যাপক ও সমাজতান্ত্রিক হাদাশ দলের নেতা। মঙ্গলবারের নির্বাচনের পর থেকে তিনি এখনো আইজেনকোটের সঙ্গে কথা বলেননি, তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
নতুন সরকার গঠন সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। চেঞ্জ ব্লকের দলনেতাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নিয়ে একমত হতে হবে এবং জোটের ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বও মেনে নিতে হবে। ডানপন্থী বিরোধী নেতা আভিগদোর লিবারম্যানই সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলছেন বলে জানা গেছে।
জাবারিনের যুক্তি, নতুন সরকার গঠনের আগেই নতুন নেসেটে নেতানিয়াহুর ৬৭ জন প্রতিপক্ষ তাদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে আইন প্রণয়ন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন। তিনি বলেন, এর শুরু হবে নেসেটের স্পিকার বদলে দিয়ে; বিরোধীরা আইনসভার এজেন্ডা তদারকি কমিটির নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে। তার মতে, বিদায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠের পাস করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বকারী আইনগুলো বাতিল করা নতুন নেসেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
জাবারিন স্পষ্ট করেছেন, বিরোধী জোটকে নেতানিয়াহুকে হটিয়ে সংখ্যালঘু সরকার হিসেবে কাজ করতে হলে ইসরায়েলি সমাজের গভীর বৈষম্যও দূর করতে হবে। তিনি বলেন, 'আমরা বছরের পর বছর প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। আইজেনকোট যদি বদলের কথা বলেন, আমি বিশ্বাস করি সেই বদল আমাদের সম্প্রদায়ের জন্যও আসা উচিত। আমাদের সমান মর্যাদা দিতে হবে। আমরা একটি রাজনৈতিক দিগন্তও চাই — যুদ্ধ থামুক এবং ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু হোক।'
ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু কী করতে পারেন, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জয়েন্ট লিস্ট নেতা। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেছেন যে আরব দলগুলো নির্বাচনী প্রচারে অবৈধভাবে কাতারি অর্থ ব্যবহার করেছে। জাবারিন একে আরব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক শক্তিকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা ও 'বিপজ্জনক উসকানি' বলে খারিজ করেছেন। তার আরেকটি উদ্বেগ, রাজনৈতিক রূপান্তর পিছিয়ে দিতে ইসরায়েলি নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারেন।




