টেক্সাসে পেট্রলের দামে ভোটের হিসাব বদলাচ্ছে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা কম অনেক ভোটারের

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে গাড়ি চালানো দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই রাজ্যেই এখন পেট্রলের বাড়তি দাম ভোটারদের রাজনৈতিক হিসাব বদলে দিচ্ছে বলে জানাচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাম্পে দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি অনেক ভোটারের কাছেই এখন তেমন বিশ্বাসযোগ্য শোনাচ্ছে না।
ডালাসের ফুয়েল সিটি নামের একটি পেট্রল পাম্পে কাজ করেন ১৯ বছর বয়সী আলিনা কার্ডেনাস। পাম্পটির গ্রানাইট কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে, প্রবেশপথের দুই পাশে ট্যাক্সিডার্মি করা হরিণ আর দিনরাত বিক্রি হওয়া গরম টাকোর পাশে, তিনি প্রতিদিন দেখছেন টেক্সাসের মানুষ আর্থিক চাপে আছেন।
কার্ডেনাসের ভাষ্য অনুযায়ী, চালকেরা আগের চেয়ে কম পেট্রল ভরছেন এবং পুরো ট্যাংক ভর্তি করা মানুষের সংখ্যাও কমেছে। অনেকেই ১০ বা ২০ ডলারের পেট্রল নিয়েই থেমে যাচ্ছেন। সিগারেট ও বিয়ারের জন্য আসা ক্রেতাদের বিল করার ফাঁকে তিনি এই পরিবর্তন নিজের চোখে দেখছেন।
স্থানীয় একটি কলেজে রেডিওলজি পড়া কার্ডেনাস নিজেও পেট্রল বাঁচাতে চলাচল কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখন মূলত বাড়িতে থাকছেন এবং শুধু কাজ ও পড়াশোনার জন্য গাড়ি চালাচ্ছেন। তাঁর কথায়, পেট্রল সত্যিই অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে এবং এ বছর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রায় তিন গুণ বড় এই অঙ্গরাজ্যে রয়েছে কয়েক লাখ মাইল সড়ক, আর অনেক যাত্রীকে কাজে যাওয়া-আসায় দিনে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত রাস্তায় কাটাতে হয়। গত এক বছরের বড় অংশ জুড়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই যাতায়াত আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট লড়াইয়ে পেট্রলের দাম বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি জেমস তালারিকো চেষ্টা করছেন রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে ৩০ বছরের বেশি সময় পর টেক্সাসের প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর হতে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্যাক্সটনের তুলনায় তালারিকো সামান্য এগিয়ে আছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার, ভোটের এক সপ্তাহ আগে, টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টিতে নোঙর করা একটি তেল ট্যাংকারের সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তাঁর চুক্তির প্রথম দশ লাখ ব্যারেল তেল রাজ্যে পৌঁছেছে। সেদিনই লাবকে প্যাক্সটনের পক্ষে এক সমাবেশে তিনি একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল বিজয় উদ্যাপন হিসেবে বর্ণনা করেন।
পরে জর্জিয়ায় আরেক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, পেট্রলের বেশি দাম আমেরিকান গ্যাস কোম্পানিগুলোর জন্য শত শত বিলিয়ন ডলার আনছে। টেক্সাসভিত্তিক দুটি বৃহত্তম কোম্পানি এক্সন ও শেভরনের কথাও সেই প্রসঙ্গে ওঠে। সমাবেশে তিনি বলেন, তারা বিপুল মুনাফা করছে।
কিন্তু ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় চালকদের অনেকেই সেই বক্তব্যে আশ্বস্ত নন। কার্ডেনাস বলেছেন, পেট্রলের বাড়তি দাম সম্ভবত তাঁকে আরও বেশি ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকতে সাহায্য করেছে এবং তিনি তালারিকোকে ভোট দেবেন।
৪০ বছর বয়সী টম এল প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ডালাসে ডেটা বিশ্লেষকের কাজে যান। তিনি মাসে প্রায় ৪০০ ডলার পেট্রলে খরচ করেন, যা এক বছর আগের দ্বিগুণ। খামারের কাজে ব্যবহৃত ডিজেল ট্রাকের জন্য তাঁর সপ্তাহে প্রায় ২০০ ডলার লাগে। তাঁর ভাষ্য, ক্ষতিপূরণের জন্য বাজেট আরও কঠোর করতে হয়েছে তাঁকে।
টম ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন বলছেন সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। সিনেটে কাকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়েও তিনি অনিশ্চিত, কারণ দুই প্রার্থীরই সুবিধা ও ত্রুটি আছে বলে তিনি মনে করেন।
টেক্সাস শীর্ষ তেল উৎপাদক হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা সাধারণত দেশের অন্য অংশের তুলনায় সস্তায় পেট্রল পান। তবু ইরান যুদ্ধের মধ্যে দাম বৃদ্ধি থেকে রাজ্যটি রেহাই পায়নি। এএএ-র হিসাব অনুযায়ী, এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম এখন ৩ ডলার ৬৮ সেন্ট, যা এক বছর আগে ছিল ২ ডলার ৫৯ সেন্ট। ডিজেলের দাম ৮০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৩ ডলার ১৮ সেন্ট থেকে ৫ ডলার ৭৯ সেন্টে পৌঁছেছে।
টেক্সাস ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির জ্বালানি অর্থায়ন বিষয়ের অধ্যাপক টম সেং বলেন, টেক্সাসের মানুষ জাতীয় গড়ের চেয়ে কম দাম দিলেও এক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি দিচ্ছেন, ফলে তারাও সবার মতোই কষ্ট অনুভব করছেন। তিনি বলেন, ভোটের দিন সকালে ভোটাররা হয়তো বিদ্যুৎ বিল খুলে দেখবেন না বা মুদি কেনাকাটাও করবেন না, কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে শেষ যে জিনিসটি তাঁদের চোখে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা হলো পেট্রলের দাম।
ডালাসের ফুয়েল সিটিতে নিরাপত্তারক্ষী কোবে মন্টগোমারি চাকরির পাশাপাশি উবার ইটস ও ডমিনোজের ডেলিভারির কাজেও গাড়ি ব্যবহার করেন। প্রয়োজন হলেই তাঁকে ট্যাংক ভরতে হয়। তবে পেট্রলের বাড়তি খরচ তেমন খেয়াল না করলেও তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটই দেবেন না বলে জানিয়েছেন, ভুল ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে পরে অনুতাপের ভয়ে।
ডায়মন্ড এম নামের এক গুদামকর্মী প্রতিদিন অন্তত তিন ঘণ্টা রাস্তায় কাটান কাজে যেতে। তাঁর হিসাবে পেট্রল তাঁর হাতে পাওয়া বেতনের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ে নিচ্ছে। তিনি শুধু শুক্রবার, বেতনের দিন, ট্যাংক ভরেন এবং পুরো সপ্তাহ সেই তেলেই চালানোর চেষ্টা করেন। তিনি তালারিকোকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস খরচ কমানোর সবচেয়ে ভালো সুযোগ তালারিকোরই আছে।




