ক্যালিফোর্নিয়ায় বিলিয়নিয়ারদের ওপর ৫ শতাংশ সম্পদ করের প্রস্তাব: দুই অর্থনীতিবিদের দুই বিপরীত হিসাব

ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা এবার এমন এক প্রস্তাবের ওপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা পাস হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো শুধু বিলিয়নিয়ারদের লক্ষ্য করে সম্পদ কর বসবে। ‘প্রপোজিশন ৪০’ নামের এই প্রস্তাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের হিসাবে এই কর থেকে রাজ্যের কোষাগারে আসবে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার, অন্য পক্ষ বলছে, এতে উল্টো রাজ্যের ক্ষতি হবে ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবটির কাঠামো মোটামুটি সরল। বিলিয়নিয়ারদের মোট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর বসানো হবে, কিছু সম্পদ এই করের বাইরে থাকবে। করটি কার্যকর হবে পূর্ববর্তী তারিখ থেকে — ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি যাঁরা ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ছিলেন, তাঁদের ওপরই এটি প্রযোজ্য হবে। এতে পাওয়া অর্থের বড় অংশ যাবে নিম্ন আয়ের ক্যালিফোর্নিয়াবাসীর স্বাস্থ্যসেবায়, যাতে ফেডারেল সরকারের মেডিকেড খাতে কাটছাঁটের ক্ষতি কিছুটা পূরণ করা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার কর ইতিহাসে এর আগেও বড় মোড় এসেছে। ১৯৭৮ সালে ভোটাররা ‘প্রপোজিশন ১৩’ অনুমোদন করেছিলেন, যা ছিল এক ঐতিহাসিক কর বিদ্রোহ এবং রিগান বিপ্লব ও দেশজুড়ে কর কমানোর আন্দোলনের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। এবারের প্রপোজিশন ৪০ ঠিক তার বিপরীত দিকে সমান বিপ্লবী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রস্তাবের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান। তিনি ইউসি বার্কলে ও প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসে কাজ করেন, সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও বার্নি স্যান্ডার্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় তাঁদের জাতীয় সম্পদ কর প্রস্তাবের নকশা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর নতুন বইয়ের নামও সরাসরি — ‘উই নিড টু ট্যাক্স বিলিয়নিয়ারস’। জুকম্যান বলেছেন, ক্যালিফোর্নিয়া যদি দেখাতে পারে যে বিলিয়নিয়ারদের ওপর কর বসানো সম্ভব, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আন্দোলনেরই সূচনা হবে না, একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনেরও জন্ম দেবে।
জুকম্যান, জ্যাসপার বল ও ইমানুয়েল সায়েজের যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি ক্যালিফোর্নিয়ার বিলিয়নিয়ারদের মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার — যা রাজ্যের সব বাসিন্দার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত মোট বার্ষিক আয়ের সমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উত্থানের জোরে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই সম্পদ বেড়েছে ১৪৪ শতাংশ। তাঁদের হিসাবে, ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাজ্যের সবচেয়ে ধনী শূন্য দশমিক ০০১ শতাংশ পরিবারের প্রকৃত সম্পদ বেড়েছে ২৫ গুণ, অথচ গড় পরিবারের প্রকৃত আয় বেড়েছে মাত্র দ্বিগুণ।
এই হিসাব থেকেই তাঁদের রাজস্ব অনুমান। ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ৫ শতাংশ থেকে কর ফাঁকি, এড়িয়ে যাওয়া এবং ১ জানুয়ারির আগেই বসবাস ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বাবদ ১০ শতাংশ বাদ দিলে রাজ্যের আয় দাঁড়ায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাঁদের দাবি, এতে রাজ্যের বিদ্যমান আয়কর রাজস্বে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
জুকম্যানের যুক্তি, বিদ্যমান কর ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো অতিধনীদের সম্পদ দ্রুত বাড়লেও তাঁরা তুলনামূলকভাবে খুব কম আয়কর দেন। বিলিয়নিয়াররা তাঁদের অর্থ এমনভাবে সাজাতে পারেন যাতে করযোগ্য আয় কম বা শূন্য থাকে; ফলে আয়করের হার তাঁদের কাছে ‘সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, সম্পদ কর এই বৈষম্য কমাতে, অতিধনীদের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতে সাহায্য করবে।
বিপক্ষে অবস্থান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও হুভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো জোশুয়া রাউয়ের। বেঞ্জামিন জারোসের সঙ্গে করা তাঁর বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উল্টো — এই কর বিলিয়নিয়ারদের রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করবে, অর্থনীতির ক্ষতি করবে এবং বিলিয়নিয়ারদের কাছ থেকে রাজ্য এখন যে আয়কর পায়, তাতেও বড় গর্ত তৈরি হবে। রাউ বলেছেন, এই কর রাজ্যের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করবে না; তাঁদের হিসাবে প্রপোজিশন ৪০ রাজ্যের ৩৯ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করবে।
রাউয়ের আরও যুক্তি, ফাঁকি ও চলে যাওয়া বাবদ মাত্র ১০ শতাংশ ছাড় ধরা অতি আশাবাদী। তাঁর হিসাবে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির সময়সীমার আগেই অন্তত সাতজন খ্যাতনামা বিলিয়নিয়ার ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে গেছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রিন, পিটার থিয়েল, ডন হ্যাঙ্কি ও স্টিভেন স্পিলবার্গ। প্রস্তাবটি সামনে আসার পর থেকেই কয়েকজন অতিধনী রাজ্য ছেড়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিতর্ক শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ঠেকাতে গঠিত একটি গ্রুপে অতিধনীরা ঢেলেছেন ৩৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অন্যদিকে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি লস অ্যাঞ্জেলেসের দ্য উইল্টার্নে ‘ক্যালিফোর্নিয়া বিলিয়নিয়ার ট্যাক্স অ্যাক্ট’-এর সমর্থনে প্রচার শুরুর সমাবেশে নেতৃত্ব দেন, যেখানে এই করকে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য জরুরি তহবিলের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সম্পদ কর অনেকটা সম্পত্তি করের মতো, তবে তা শুধু জমি-বাড়িতে সীমাবদ্ধ নয় — শেয়ার, সুপারইয়ট, বাস্কিয়াতের চিত্রকর্ম, ডাইনোসরের কঙ্কাল, মার্সিডিজ জি ওয়াগন থেকে সামুরাই তলোয়ার পর্যন্ত ধনীদের প্রায় সব সম্পদই এর আওতায় পড়ে। যেসব সম্পদের লেনদেন বিরল, সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ জটিল — কেনা দাম, সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য নাকি বিমা মূল্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের বড় অংশই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ারে থাকায় সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে সম্পদ করের অতীত অভিজ্ঞতা অবশ্য হতাশাজনক। জুকম্যান নিজেও তাঁর নতুন বইয়ে লিখেছেন, অতীতের সম্পদ করগুলো ‘ব্যাপকভাবে ব্যর্থ’ হয়েছে। ফ্রান্স ২০১৮ সালে নিজের সম্পদ কর বাতিল করে; সেখানে ব্যবসায়িক সম্পদে ছাড় ছিল বড় একটি ফাঁক, যা রাজস্ব অনেক কমিয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে নরওয়েতে ১৮৯২ সাল থেকে সম্পদ কর চালু আছে; সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর বাড়ানোর পর সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ১০০ ধনী ব্যক্তি দেশ ছেড়েছেন, কিন্তু তাতে রাজস্বের লাভে বড় কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি। তবে সমালোচকদের যুক্তি, নরওয়ে একটি দেশ — সেখান থেকে অন্য দেশে যাওয়া আর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নেভাদায় চলে যাওয়া এক কথা নয়।
অতীতের ব্যর্থতা এড়াতে প্রপোজিশন ৪০-এর নকশায় ফাঁক বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। ফ্রান্সের পুরোনো করের মতো এখানে ব্যবসায়িক সম্পদে ছাড় নেই — বিলিয়নিয়ারদের নিজের চালিত কোম্পানির শেয়ারও করের আওতায় থাকবে। আর করটি এককালীন ও পূর্ববর্তী কার্যকারিতাসম্পন্ন হওয়ায়, শুধু রাজ্য ছেড়ে গেলেই বিল এড়ানো যাবে না বলে নকশাকারদের আশা। এই বিধানগুলো বাস্তবে কাজ করবে কি না, সেটিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। ভোটের ফল যেদিকেই যাক, তা যুক্তরাষ্ট্রের করনীতিতে, এমনকি বিশ্বজুড়ে অতিধনীদের ওপর কর আরোপের আলোচনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।




