সালমান এফ রহমান ও ছেলেসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের তিন মামলা: ১ হাজার ১২১ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ, ঋণ নিয়ে পাচারের অভিযোগ ৩৬ হাজার কোটি

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ছেলে এ এস এফ রহমান ও ব্যাংক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শেয়ারবাজারে জালিয়াতি, প্লেসমেন্ট শেয়ার কারসাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
দুদক জানিয়েছে, অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৪ হাজার ৭৫৫ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদকের অনুসন্ধানকারী দল।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা পেয়ে সালমান এফ রহমান, তার ছেলে এ এস এফ রহমানসহ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ মোট ৬৯ জনকে আসামি করে পৃথক তিনটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। তিন মামলায় ১৩ জন আসামি তিনটিতেই রয়েছেন; ফলে তিন মামলা মিলিয়ে পৃথক আসামির সংখ্যা ৩১ জন।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এ তথ্য জানিয়েছেন।
দুদক জানায়, তিনটি মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭ক ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের মাধ্যমে স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড, আরবান ফ্যাশনস লিমিটেড ও মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ঋণ ও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সুবিধা নিয়ে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি দেখানো হয়। এর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তিনটি মামলার অভিযোগে সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সংশ্লিষ্ট পোশাক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। অভিযোগে জনতা ব্যাংকের তৎকালীন সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের কথা বলা হয়েছে।
প্রথম মামলায় স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ ১ হাজার ১৭১ টাকা, দ্বিতীয় মামলায় আরবান ফ্যাশনস লিমিটেডের নামে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৬ টাকা এবং তৃতীয় মামলায় মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫২৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নবসৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনুকূলে ঋণ ও ইডিএফ সুবিধা মঞ্জুর করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। পরে নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হয়।
স্প্রিংফুল অ্যাপারেলসের ক্ষেত্রে ১ কোটি ৭০ লাখ ৬১ হাজার ৫৮২ মার্কিন ডলারের কথিত বিল তৈরি করা হয়। এর বিপরীতে দেশে আসে মাত্র ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৯২ ডলার। বাকি ১ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ১৯০ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি, আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড মামলায় আসামি ২২ জন।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমান, তার ছেলে এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কে চৌধুরী এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল আহমেদ, এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা। এছাড়া স্প্রিংফুল অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাইমিনুল ইসলাম ও পরিচালক কোহিনুর আবেদিন, ক্রিসেন্ট অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর রয়েছেন। আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডইর স্বত্বাধিকারী আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমান এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদসহ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারাও আসামি হয়েছেন।
দ্বিতীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, আরবান ফ্যাশনসের নামে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭৭ ডলার বা প্রায় ৪১৭ কোটি ৪ লাখ টাকার পেমেন্ট নেওয়া হয়। নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে এ অর্থ আত্মসাৎ এবং নগদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। আরবান ফ্যাশনস লিমিটেড মামলায় আসামি করা হয়েছে ২২ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আরবান ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল উদ্দিন ও পরিচালক সাহিদা রহমান এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা।
তৃতীয় মামলায় মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের নামে ৬ কোটি ৬২ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৮ ডলার বা প্রায় ৫৬৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার পেমেন্ট নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫২৭ টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেড মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৫ জন।




