পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই আরিচা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কাজ, এক্সিট প্ল্যানও নেই প্রকল্পে

আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ), পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (টিএমপি) ছাড়াই কাজ চলার তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ফিজিবিলিটি স্টাডি না করায় প্রকল্প দলিলে ইআইএ, ইএমপি কিংবা টিএমপি-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২১-২০২২ থেকে ২০২৫-২০২৬ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়। মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ১ হাজার ১৭৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা অনুমোদিত বাজেটের প্রায় ৭১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
প্রথম অর্থবছরে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রাক্কলন থাকলেও প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব ও ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৫৬৫ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে ৪৭৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৩৮৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।
প্রকল্পের প্রায় ৯৮ শতাংশ অর্থ অবকাঠামো নির্মাণ ও মূলধন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ, সড়ক বাঁধ, নতুন সড়ক, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু, আন্ডারপাস, কালভার্ট, ড্রেন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ১৫টি পিসি গার্ডার সেতুতে ১২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, সাতটি আন্ডারপাসে ৪৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং পানি নিষ্কাশন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দের কথা নথিতে রয়েছে।
জমি অধিগ্রহণে মূল বরাদ্দ ছিল ৬৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। মে ২০২৬ পর্যন্ত অধিগ্রহণ পুরোপুরি শেষ না হলেও ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭১ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা প্রাক্কলনের চেয়ে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা বেশি। মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অংশে ৭ ধারার নোটিশ ও মূল্যায়ন শেষ না হওয়ায় জমি হস্তান্তর হয়নি এবং ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকল্পের ১০টি ওয়ার্ক প্যাকেজের (ডব্লিউপি-০১ থেকে ডব্লিউপি-১০) অগ্রগতিতে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। মে ২০২৬ পর্যন্ত সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৭২ শতাংশ হলেও ডব্লিউপি-০৬ প্যাকেজে অগ্রগতি মাত্র ৩২ শতাংশ, ডব্লিউপি-০৪ ও ডব্লিউপি-০৭ প্যাকেজে ৪৯ শতাংশ করে, আর ডব্লিউপি-০৯-এ ৮৬ শতাংশ ও ডব্লিউপি-১০-এ ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
৫৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে গণপরিবহন থামানো ও যাত্রীদের নিরাপদ ওঠানামার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাস বে বা আধুনিক যাত্রী ছাউনি রাখা হয়নি। নির্মিত পিসি গার্ডার সেতুগুলোর ডেক স্ল্যাবে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রমিত ২ শতাংশ ক্রস স্লোপ বিবেচনা না করে ঢালাই করা হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রকল্প শেষে সড়ক পরিচালনা, বার্ষিক মেরামত বাজেট এবং জমি ও নকশা হস্তান্তরের কোনো সুনির্দিষ্ট এক্সিট প্ল্যান প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান বলেছেন, মহাসড়ক নির্মাণে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; নকশা, পানি নিষ্কাশন, যান চলাচলের নিরাপত্তা ও নির্মাণকালীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সড়কের বিভিন্ন অংশে কাজের অগ্রগতিতে বড় পার্থক্য থাকলে যান চলাচলে বিঘ্ন ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি বলেন।
আইএমইডির জরিপে ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ বাসিন্দা জানিয়েছেন নির্মাণকালে ধুলোদূষণ রোধে পানি কেবল মাঝে মাঝে ছিটানো হয়, আর ৭ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছেন কখনো পানি ছিটানোই হয় না। অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণসামগ্রী ও ড্রেনের আবর্জনা ফেলে রাখায় ১০ শতাংশ পথচারী প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) মো. খালেদ হাসান বলেছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মেগা প্রকল্পগুলোতে ইআইএ করা হয়ে থাকে এবং এতে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। কোনো প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর বলেছেন, নির্মাণকাজে গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।




