মজুরি আন্দোলন ঘিরে মিরপুর-গাজীপুরে সাড়ে ১৪ হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি, গ্রেপ্তার অন্তত ৫৯ জন

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে মিরপুর ও গাজীপুরে দায়ের করা মামলাগুলোতে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। দুই এলাকা থেকে অন্তত ৫৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ৩০ হাজার টাকার দাবিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দুই দিন ধরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে। ঘটেছে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে; এরই মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ডও গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর পর্যন্ত মিরপুরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় চারটি মামলায় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মিরপুরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা এবং ২৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়।
অন্যদিকে গাজীপুরে তিনটি মামলায় প্রায় চার হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার দুটি করেছে শিল্প পুলিশ এবং একটি গাজীপুর মহানগর পুলিশ। সেখানে অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।
সোমবার সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার শফিপুর, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ এবং গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনকারীরা পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে পৌঁছে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়; একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।
একই সকালে সাভারের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তাঁরা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। এ সময় নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, টাউজার লাইন, অনন্ত গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় রবিবারের মতো সোমবারও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ বাধা দেয়; শ্রমিকরা ইটপাটকেল ছুড়লে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ ঘটে, পুলিশ টিয়ারশেল ছোড়ে এবং শ্রমিকরা নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করেন।
সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছেন, চলমান সহিংসতার নেপথ্যে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শিল্পমালিক রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার দাবিও করেছেন তিনি। তবে ব্রিফিংয়ে অভিযুক্ত শিল্পমালিকদের পরিচয়, সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত কয়েক দিন ধরে একটি পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিক ভাইবোনদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। এর পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতায় কিছু শিল্পমালিকও জড়িত—তাঁদের কেউ বিগত সরকারের সময় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন; ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ দাবি করেছে, মিরপুরের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী শ্রমিক পরিচয়ে অংশ নিয়ে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন; তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
সোমবার বিকালে সাভারে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সরকার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং বোর্ড কার্যক্রমও শুরু করেছে। এরপরও যাঁরা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডকে পুলিশ শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করছে না; তাঁদের ও পেছনে থাকা ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ইতিমধ্যে অনেক বিশৃঙ্খলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, আন্দোলনের মধ্যে হেলমেট ও মুখোশ পরা কিছু ব্যক্তি ভাঙচুর ও সহিংসতায় জড়িয়েছেন। তাঁদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু দুষ্কৃতকারী শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পোশাকশিল্পে বিভিন্ন অঞ্চল ও ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের শ্রমিকরা কাজ করেন, শ্রমিক সংগঠনও অনেক এবং প্রত্যেকের দাবি ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে; ফলে অনেক সময় আন্দোলন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয় না। একপর্যায়ে কিছু ব্যক্তি কারখানার ফটকে ধাক্কাধাক্কি, ভাঙচুর কিংবা ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে; তখন দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন।
আবদুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, গত দুই দিনের ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন—কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, কেউ কেউ এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডিএমপি ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের পিকআপসহ কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; তবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়, সংশ্লিষ্ট দল মূল্যায়ন করে তা নির্ধারণ করবে। মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশের গাড়ি, কারখানার ফটক কিংবা অন্য সম্পদের ক্ষতি হলে তা ফৌজদারি অপরাধ; তাৎক্ষণিকভাবে জড়িতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয় এবং পরে তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কারখানাগুলোর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের পোশাকশ্রমিক আন্দোলনের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৩৫টি ফৌজদারি মামলায় ১৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আনুমানিক ৪৪ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের মামলা শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও হয়রানির আশঙ্কা তৈরি করে।




