উড়ন্ত টহলযান নামাল ফ্লোরিডার পুলিশ, তবে নিয়মিত টহলে উড়তে এখনো অনুমতির অপেক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পুলিশের টহলে এবার যুক্ত হলো উড়ন্ত যান। লেকল্যান্ডের ফ্লোরিডা পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি পুলিশ বিভাগ একটি একক আসনবিশিষ্ট বৈদ্যুতিক উড়ন্ত যান চালু করেছে, যার ডাকনাম দেওয়া হয়েছে অ্যাস্ট্রো। জেটসন কোম্পানির তৈরি জেটসন ওয়ান মডেলের এই যানটিকে পুলিশের টহলযান হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের চালকসহ বৈদ্যুতিক উড়ন্ত যান নিজেদের বহরে যুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটি। জেটসনও একে বিশ্বে প্রথম বলে দাবি করেছে। তবে নিয়মিত পুলিশ টহলে ব্যবহারের আগে অ্যাস্ট্রোর জন্য ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) অনুমোদন এখনো বাকি।
অ্যাস্ট্রোর নাম এসেছে ক্লাসিক কার্টুন ‘দ্য জেটসনস’-এর কুকুরের নাম থেকে। যানটি বৈদ্যুতিক ভার্টিক্যাল টেকঅফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং, অর্থাৎ ইভিটিওএল প্রযুক্তিতে চলে, ফলে রানওয়ে ছাড়াই সরাসরি ওপরের দিকে উঠতে পারে। সাধারণ পুলিশ হেলিকপ্টারের তুলনায় এর কাঠামো ছোট এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের সুবিধার জন্য ভাঁজ করা যায়। এর ককপিট খোলা, চারপাশে হালকা কাঠামো রয়েছে।
আটটি বৈদ্যুতিক মোটর আটটি প্রোপেলার চালায় এবং চার-অক্ষের জয়স্টিক দিয়ে চালক যানটি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফ্লোরিডা পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি আইনশৃঙ্খলা কাজে এর সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য জেটসন ওয়ানকে বেছে নিয়েছে। যানটি ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে এসে পৌঁছায়। এরপর পুলিশ কর্মীরা উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ প্রধান অ্যারন মারে।
জেটসনের তথ্য অনুযায়ী, যানটির নিবন্ধন নম্বর এন৯১১এফপি, যা জরুরি সেবা ও ফ্লোরিডা পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটিকে নির্দেশ করে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, অ্যাস্ট্রো মূলত একটি স্ট্যান্ডার্ড জেটসন ওয়ান, যাতে পুলিশের আলো যুক্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা হাতে ধরা রেডিও ব্যবহার করেন এবং যানটিতে অ্যাকশন ক্যামেরার মাউন্ট রয়েছে। ভবিষ্যতে চালক-নিয়ন্ত্রিত সার্চলাইট যুক্ত করা যেতে পারে।
জেটসনের প্রকাশিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, অ্যাস্ট্রো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬৩ মাইল গতিতে উড়তে পারে, যা সড়ক ও যানজট এড়িয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে স্বল্প দূরত্ব দ্রুত অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট। তবে ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে: একবার চার্জে এটি প্রায় ২০ মিনিট উড়তে পারে। ২৪০ ভোল্টের সংযোগে রিচার্জে প্রায় ৯০ মিনিট লাগে, আর সাধারণ গৃহস্থালি আউটলেটে লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। অবশ্য ব্যাটারি বদলে ফেলা যায়, ফলে চার্জ করা ব্যাটারি থাকলে আবার দ্রুত ওড়া সম্ভব।
ওজনের সীমাও কঠোর। জেটসন নিশ্চিত করেছে, ২১০ পাউন্ডের সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে চালক, পুলিশের সরঞ্জাম ও জরুরি সামগ্রী সবকিছু ধরতে হবে। এই সীমা একজন কর্মকর্তা কতটা সরঞ্জাম বহন করতে পারবেন, তা সীমিত করে দিতে পারে। নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে কোম্পানি জানিয়েছে, একটি মোটর বিকল হলেও যানটি উড়তে পারে, এতে স্বয়ংক্রিয় অবতরণ ব্যবস্থা এবং জরুরি অবস্থার জন্য ব্যালিস্টিক প্যারাশুট রয়েছে।
জেটসনের তালিকা অনুযায়ী, কর ও অতিরিক্ত ফি বাদে যানটির দাম ১ লাখ ৪৮ হাজার ডলার, যা একটি পুলিশ বিভাগের জন্য বড় বিনিয়োগ। বিশ্ববিদ্যালয় জানতে চায়, সড়ক চলাচল কঠিন হয়ে পড়লে অ্যাস্ট্রো কর্মকর্তাদের সাড়া দিতে সাহায্য করতে পারে কি না। ফ্লোরিডায় বড় ঝড়ের পর সড়ক প্লাবিত হতে পারে, ধ্বংসাবশেষ পথ আটকে দিতে পারে এবং জরুরি দলগুলোর পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আবহাওয়া ও উড্ডয়ন পরিস্থিতি অনুকূল হলে সরাসরি ওপরের দিকে ওঠা ছোট যান ক্ষয়ক্ষতি জরিপে সাহায্য করতে পারে।
পুলিশ প্রধান অ্যারন মারে মনে করেন, অ্যাস্ট্রো কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাস পর্যবেক্ষণ করতে এবং প্রচলিত যানবাহনে সহজে পৌঁছানো যায় না এমন স্থানে যেতে সাহায্য করতে পারে। বিভাগটি এটি দিয়ে জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও যাচাই করতে চায়। মারে বলেন, ‘অ্যাডভান্সড এয়ার মোবিলিটি একটি উদীয়মান প্রযুক্তি, এবং এটি যেভাবে বিকশিত হচ্ছে, আমরা হয় সক্রিয় হতে পারি, নয়তো প্রতিক্রিয়াশীল থাকতে পারি।’
তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। অ্যাস্ট্রোতে কেবল চালকই থাকেন; এটি আহত কাউকে পরিবহন করতে পারে না, কিংবা উদ্ধার অভিযান থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। চালকের ওজন ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে কতটা জরুরি সামগ্রী বহন করা যাবে, তা নির্ধারিত হবে।
নিয়ন্ত্রক বাধাটিও বড়। জেটসন ওয়ান তৈরি হয়েছে এফএএর পার্ট ১০৩ আল্ট্রালাইট নিয়মের আওতায় বিনোদনমূলক যান হিসেবে। এসব নিয়মে প্রচলিত বিমান বা চালকের সনদ ছাড়াই যোগ্য আল্ট্রালাইট যান চালানো যায়, তবে ব্যবহার কেবল বিনোদন বা ক্রীড়া উদ্দেশ্যে সীমিত। পুলিশ টহল সেই অনুমোদিত ব্যবহারের বাইরে পড়ে। এফএএর নির্দেশনা বিশেষভাবে বলেছে, আকাশ থেকে জরিপ ও টহল পার্ট ১০৩-এর আওতায় চালানো যায় না।
জেটসন জানিয়েছে, জননিরাপত্তা কাজে অ্যাস্ট্রো ব্যবহারের জন্য ফ্লোরিডা পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির পার্ট ৯১ নিয়মের আওতায় অতিরিক্ত ফেডারেল অনুমোদন প্রয়োজন। অক্টোবরের মাঝামাঝি যানটি ঘোষণার সময় বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছিল, অনুমোদন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং নভেম্বর বা ডিসেম্বরে অনুমোদন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। নিয়মিত কার্যকর পুলিশ টহল কবে শুরু হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।
পুলিশের সম্ভাব্য দায়িত্বের বাইরে অ্যাস্ট্রো শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি গবেষণা প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০২৬ সালের শরতে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বৈদ্যুতিক বিমান প্রযুক্তি এবং এর পরিচালনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অ্যাস্ট্রোর উড্ডয়ন তথ্য গবেষণা ও সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ সিমুলেশন নিয়েও কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে জানা গেছে।
ফ্লোরিডা আরও বিস্তৃতভাবে অ্যাডভান্সড এয়ার মোবিলিটি নিয়ে এগোচ্ছে। কাছের অবার্নডেলে সানট্র্যাক্স পরিবহন পরীক্ষা কেন্দ্রে উদীয়মান বিমান প্রযুক্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট আকাশ পরীক্ষা ট্র্যাক রয়েছে। ফেডারেল অ্যাডভান্সড এয়ার মোবিলিটি পাইলট প্রোগ্রামে ফ্লোরিডার অংশগ্রহণের আওতায় পরীক্ষা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শুরু হওয়ার কথা। তবে এই রাজ্যব্যাপী পরীক্ষা পুলিশ কাজে অ্যাস্ট্রোর মুলতবি অনুমোদন থেকে আলাদা।
পুলিশ হেলিকপ্টার কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল সম্পদ লাগে। ছোট বৈদ্যুতিক যান নির্দিষ্ট কাজে, বিশেষ করে কোনো এলাকার দ্রুত আকাশ থেকে দৃশ্য পাওয়ার প্রয়োজনে, একটি বিকল্প হতে পারে। তবে স্বল্প উড্ডয়ন সময়ের অর্থ হলো প্রতিটি মিশন সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। ব্যাটারি বদল বারবার উড্ডয়নে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মিশনের মাঝে অবতরণ করতেই হবে। আবহাওয়া ও আকাশসীমার বিধিনিষেধও ব্যবহার সীমিত করতে পারে।




