সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সংঘাতে পোল্যান্ডের সংকট আরও গভীর, পদত্যাগ করলেন তিন রাষ্ট্রদূত

পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের সভাপতিকে স্থগিত করার ঘটনাকে ঘিরে দেশটির সাংবিধানিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকেরা, আর সরকারের দাবি—তারা আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের কাজই করছে।
শুক্রবার গভীর রাতে ট্রাইব্যুনাল ভবনের সামনে সংঘাতের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। বিচারক আনা করউইন-পিওত্রোভস্কা ট্রাইব্যুনালের সভাপতি বগদান শভিয়েঁচকভস্কি ও তাঁর ডেপুটি বার্তলোমিয়েই সোখানস্কিকে এক মাসের জন্য স্থগিত করার আদেশ দেন। এরপর আদালত চত্বরের বাইরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং তিনজনকে আটক করা হয়।
সংঘাতের খবর পেয়ে প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি তাঁর বিমান ঘুরিয়ে ওয়ারশতে ফিরে আসেন এবং সেনেগাল সফর বাতিল করেন। দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয় ট্রাইব্যুনালের বাইরে, যেখানে জড়ো হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা।
নাভরোৎস্কির কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক নীতি ব্যুরোর প্রধান মার্চিন পশিদাচ সোমবার সকালে ইউরোপীয় টেলিভিশনে টাস্কের পদক্ষেপের নিন্দা করে বলেন, ‘টাস্ক সরকারের ঘনিষ্ঠ আইনজীবীরাও বলছেন, এ ধরনের আচরণের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
এই সংকটের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। প্রতিবাদে অন্তত তিনজন পোলিশ রাষ্ট্রদূত পদত্যাগ করেছেন। পশিদাচ জানান, ২০২১ সাল থেকে জাতিসংঘে পোল্যান্ডের স্থায়ী প্রতিনিধি কশিশতফ শ্চেরস্কি সোমবার পদত্যাগ করেছেন; এর আগে সপ্তাহান্তে চীন ও রোমানিয়ায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতেরা পদত্যাগ করেন।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের ইউরোপবিষয়ক জ্যেষ্ঠ দূত সিমোন রোদান-বেনজাকেন বলেন, ‘এই সংকট শুক্রবার শুরু হয়নি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পোল্যান্ড গভীরভাবে আপসকৃত একটি সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বেঁচে আছে।’ তাঁর মতে, সংসদ সংবিধান অনুযায়ী বিচারক নিয়োগ দিয়ে গেলেও সরকার, প্রেসিডেন্সি ও ট্রাইব্যুনালের বছরের পর বছর ধরে চলা অচলাবস্থায় কয়েকটি নিয়োগ দায়িত্ব নেওয়া থেকে আটকে আছে।
প্রধানমন্ত্রী টাস্ক সোমবার তাঁর সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, সংঘাতের সমাধান সহজ—প্রেসিডেন্টকে সংসদের বৈধভাবে নির্বাচিত বিচারকদের স্বীকৃতি দিতে হবে, কারণ সংবিধান সেটাই নির্দেশ করে। তিনি নাভরোৎস্কির বিরুদ্ধে জোরপূর্বক সংঘাত বেছে নেওয়ার অভিযোগ এনে বলেন, আইনের শাসনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সহিংসতার কাছে নতি স্বীকার করতে পারে না।
অন্যদিকে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মার্গারেট থ্যাচার সেন্টার ফর ফ্রিডমের পরিচালক নাইল গার্ডনার শুক্রবারের ঘটনাকে টাস্কের ‘অভ্যুত্থানের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নাভরোৎস্কি দেশের বাইরে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
তবে লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ার বোশতিয়ান উদোভিচ ‘অভ্যুত্থান’ আখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে আগের সরকারের আমলের সেই বিচারিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, যা পোল্যান্ডের সংবিধান ও ইউরোপীয় আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
ইউরোপীয় কমিশন মূলত বিচারক নিয়োগে পোল্যান্ডের সংসদের কর্তৃত্বকেই সমর্থন করেছে। ইউরোপীয় কমিশনার মাইকেল ম্যাকগ্রা বলেছেন, নতুন বিচারক বাছাই সংসদের ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে। ফ্রান্সের বিরোধী নেতা মেরিন ল্য পেন ব্রাসেলসের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছেন, আর পোল্যান্ডে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম রোজ সংযমের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমেরিকা পোল্যান্ডের পাশে আছে।
রোদান-বেনজাকেনের মতে, আইনের শাসন পুনরুদ্ধার অপরিহার্য হলেও সেই পুনরুদ্ধারের বৈধতা নির্ভর করে শুধু উদ্দেশ্যের ওপর নয়, ব্যবহৃত পদ্ধতির বৈধতার ওপরও। পোল্যান্ডে সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর বাকি থাকায় আইনের শাসনের সংজ্ঞা নিয়ে এই লড়াই সপ্তাহান্তের সংঘাতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




