১১ কোটি ৫০ লাখ বছর পুরোনো ডাইনোসরের হাড়ে জীবাশ্ম লোহিত রক্তকণিকার সন্ধান বিজ্ঞানীদের

১১ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বেঁচে থাকা একটি ডাইনোসরের হাড় বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মে পরিণত লোহিত রক্তকণিকার মতো গঠন এবং রক্তকে লাল রং দেওয়া অণুর চিহ্ন পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
গবেষক দলটি একটি ছোট মাংসাশী ডাইনোসর অ্যারাটাসরাসের পেছনের পায়ের হাড় পরীক্ষা করেছে। এই ডাইনোসরটি বর্তমান ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাস করত এবং সেখানেই মারা গিয়েছিল।
ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের ছবিতে হাড়ের ভেতরে সূক্ষ্ম নালিগুলোতে — যেখানে একসময় রক্তনালি ছিল — ছোট গোলাকার গঠন দেখা গেছে, যা লোহিত রক্তকণিকার মতো দেখতে। রাসায়নিক পরীক্ষায় ‘হিম’-এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে; হিম হলো সেই জৈব যৌগ, যা হিমোগ্লোবিনকে শরীরজুড়ে অক্সিজেন বহন করতে সাহায্য করে।
এ ধরনের দাবি বিতর্কিত, কারণ জৈব টিস্যু ও অণু দ্রুত ভেঙে যেতে পারে এবং প্রাচীন জীবাশ্মে তার সামান্য চিহ্নই থাকে বা একেবারেই থাকে না। তবে দাবিটি নিশ্চিত হলে বিজ্ঞানীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন পথ খুলবে — ডাইনোসরের রক্ত, বিপাকক্রিয়া, এমনকি তাদের সক্রিয়তার মাত্রা নিয়েও গবেষণা করা যাবে।
গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেওয়া পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লিতি গ্রাইস বলেন, ‘আমরা ডাইনোসরের মূল জীববিজ্ঞানের একটি খনিজ ও আণবিক প্রতিধ্বনি দেখতে পাচ্ছি। হিম-সম্পর্কিত স্বতন্ত্র রসায়নসহ জীবাশ্ম লোহিত রক্তকণিকা কোনো জীবাশ্মে, ডাইনোসর তো দূরের কথা, এর আগে কখনো স্বস্থানে পাওয়া যায়নি। এটি বিশ্বে প্রথম।’
অ্যারাটাসরাসের জীবাশ্ম ধ্বংসাবশেষ ২০০৮ সালে একটি খনিতে আবিষ্কৃত হয়। এরপর থেকে সেগুলো ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরে রাখা আছে, যেখানে গবেষকেরা সেগুলো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ডাইনোসরের পেছনের পায়ের হাড় বিশ্লেষণের সময় গ্রাইস লোহিত রক্তকণিকার মতো গঠনগুলো লক্ষ করেন।
রাসায়নিক পরীক্ষায় হিম ও এর ভাঙনজাত উপাদান পজিটিভ আসায় গবেষকদের সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। পরীক্ষায় কোলাজেনের অ্যামিনো অ্যাসিড গঠন-উপাদানের চিহ্নও পাওয়া গেছে; কোলাজেন সংযোজকসহ বিভিন্ন টিস্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন।
গঠনগুলো সত্যিই জীবাশ্ম লোহিত রক্তকণিকা হলে প্রশ্ন ওঠে, সেগুলো সংরক্ষিত হলো কীভাবে। গ্রাইসের মতে, রক্তকণিকার ভেতরে ও চারপাশে তৈরি হওয়া ম্যাঙ্গানিজ যৌগ হাউসম্যানাইট জীবাশ্মে পরিণত হওয়ার আগে সেগুলোকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে থাকতে পারে। একই প্রক্রিয়া অ্যামিনো অ্যাসিড সংরক্ষণেও সাহায্য করে থাকতে পারে বলে তিনি যোগ করেন। গবেষণাটি প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেরি শোয়াইৎজার, যিনি ডাইনোসরের জীবাশ্মে রক্তনালি ও নরম টিস্যুর অবশেষ আবিষ্কার করেছেন, তিনি নিশ্চিত নন যে গ্রাইস ও তাঁর সহকর্মীরা লোহিত রক্তকণিকাই পেয়েছেন। তাঁর সন্দেহের একটি কারণ হলো, ডাইনোসরের লোহিত রক্তকণিকায় নিউক্লিয়াসের ফোলা অংশ থাকার কথা, যাতে সেগুলো দুই দিকেই গম্বুজের মতো দেখায়। গ্রাইসের পাওয়া গঠনগুলো অবতল, যা ইঙ্গিত দেয় সেগুলো অন্য কিছুও হতে পারে।
তবে হাড়ে হিম ও কোলাজেন অ্যামিনো অ্যাসিডের আবিষ্কারে শোয়াইৎজার তুলনামূলক বেশি আস্থা রেখেছেন। তিনি বলেন, অসাধারণভাবে সংরক্ষিত জীবাশ্ম থেকে আরও অনেক কিছু শেখার আছে। তাঁর ভাষায়, ‘জীবাশ্মবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা — সব অন্তর্জাত জৈব পদার্থ এক মিলিয়ন বছর বা তার কম সময়ে মুছে যাবে — নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, এবং জীবাশ্ম নমুনায় প্রযুক্তিগত পদ্ধতি আরও নিয়মিত প্রয়োগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা চলতেই থাকবে।’
গবেষণাটি আরেকটি প্রশ্নও তুলেছে — বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম সংগ্রহশালায় আর কী কী জৈব উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে গ্রাইস চরম সতর্কতার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাঁর কাজের অর্থ এই নয় যে প্রোটিন বা ডিএনএর মতো বড় জৈব অণু প্রাচীন জীবাশ্মে টিকে আছে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো অসাধারণ দাবির জন্য অসাধারণ বিশ্লেষণী প্রমাণ দরকার। উদ্দেশ্য জুরাসিক পার্কের ডিএনএ খোঁজা নয়; উদ্দেশ্য হলো সুগভীর সময় আসলে কতটা প্রকৃত আণবিক তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে, তা নির্ধারণ করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্যিকারের রোমাঞ্চকর ইঙ্গিত হলো, অসাধারণ আণবিক তথ্য হয়তো ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জাদুঘরের সংগ্রহে বসে আছে — অপেক্ষা করছে, আমরা পুরোনো জীবাশ্মগুলোর কাছে নতুন প্রশ্ন নিয়ে যাই।’




