ডেঙ্গুতে এ বছর আক্রান্ত এক লাখ ৩৩ হাজার, মৃত্যু ৪১৮ জনের; টেকসই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা মৌসুমি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রায় ২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে রোগটির প্রকোপ বাড়ে, হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ সৃষ্টি হয় এবং অসংখ্য পরিবার প্রিয়জন হারায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এক লাখ ৩৩ হাজার ৩৬৭ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৪১৮ জন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গুর সংক্রমণ মৌসুম এখনো শেষ হয়নি।
গবেষণালব্ধ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নভেম্বর জুড়েও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির নিশ্চয়তা নেই। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সংক্রমণ কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু অন্যান্য বছরের তুলনায় তা কতটা কমবে, সে বিষয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই। ফলে বছরের শেষ পর্যন্ত নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
কয়েক বছরের পরিসংখ্যান এই চিত্রের গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে। ২০২৩ সালে দেশে তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের।
২০২৫ সালেও এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং প্রাণ হারান ৪১৩ জন। ২০২৬ সালের অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাদুর্ভাব নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একসময় ডেঙ্গুকে প্রধানত ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলার পরিকল্পনা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হলে চলবে না; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগ নজরদারি, বাহক মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। মশক নিধন অভিযান, ক্রাশ প্রোগ্রাম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক প্রচারণা ও কীটনাশক ছিটানোর মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেনি। প্রশ্ন উঠেছে, এসব কার্যক্রম কতটা বৈজ্ঞানিক, লক্ষ্যভিত্তিক, সমন্বিত ও ফলাফলনির্ভর।
অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচির সাফল্য মাপা হয় কতবার ওষুধ ছিটানো হয়েছে, কতটি এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে কিংবা কতটি প্রচারণা চালানো হয়েছে—এসব দিয়ে। অথচ প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করতে হবে মশার ঘনত্ব কতটা কমেছে, সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং রোগ ও মৃত্যু কতটা হ্রাস পেয়েছে, তার ভিত্তিতে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এর বাহক এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ। এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের সামগ্রী, টায়ার, পানির ট্যাংক ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এই মশার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে। তাই শুধু ড্রেন, ডোবা, নর্দমা বা রাস্তায় কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, প্রাপ্তবয়স্ক মশা দমন, নিয়মিত মশার ঘনত্ব পরিমাপ ও কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। সব এলাকায় একই পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও কার্যকর হবে না; কোনো এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, কোথাও প্রজননস্থলের ধরন ভিন্ন, আবার কোথাও ব্যবহৃত কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে একজন অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদ থাকা উচিত বলে মত দেওয়া হয়েছে, যাঁর মশার জীববিজ্ঞান, বাস্তুতত্ত্ব, কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বাহক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় প্রতিষ্ঠানটির অধীনে জাতীয় পর্যায়ে মশা ও রোগের নজরদারি, নিয়মিত কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তকরণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি সহায়তা এবং কর্মসূচির ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণও অপরিহার্য, কারণ এডিস মশার প্রজননস্থলের বড় অংশ মানুষের বসতবাড়ি ও ব্যক্তিগত স্থাপনার ভেতরে বা আশপাশে তৈরি হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল শেষ হলেও ডেঙ্গু সংকট শেষ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও পরিবেশগত পরিবর্তন মশার বিস্তার ও সংক্রমণের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিবছর প্রকোপ বাড়ার পর তড়িঘড়ি অভিযান চালানোর পরিবর্তে সারা বছর ধরে পরিচালিত একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে; বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত, প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এই বিশ্লেষণটি লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।


