ঋতু বদলের সময় বাড়ে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ: কারা ঝুঁকিতে, বাঁচার উপায় কী
প্রকৃতির নিয়মে ঋতু বদলালেও এই সময়ে স্বাস্থ্যের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব প্রতিবছরই এক পরিচিত দৃশ্য। তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার হেরফেরের পাশাপাশি এই সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকেন শিশু, প্রবীণ এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা।
ঋতু পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বেশি রোগব্যাধির প্রকোপ যায় শ্বাসতন্ত্রের ওপর। প্রায়ই দেখা যায়, দুই-তিন দিন নাক বন্ধ থাকে বা নাক দিয়ে পানি ঝরে; গলাব্যথা করে, শুকনা কাশি থাকে, জ্বরও থাকতে পারে। এগুলো বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত। লক্ষণভিত্তিক কিছু চিকিৎসায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা ছাড়াই এগুলো ভালো হয়ে যায়; কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। সতর্কতামূলক কিছু ব্যবস্থা নিলেই এই সময়ে মোটামুটি সুস্থ থাকা সম্ভব।
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ শ্বাসযন্ত্রকেই আক্রমণ করে, যার মধ্যে রয়েছে নাক, গলা, শ্বাসনালী ও ফুসফুস। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে নির্গত ক্ষুদ্র ড্রপলেট ও অ্যারোসোলের মাধ্যমে একজনের থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এই অণুজীব শ্বাসযন্ত্রে আক্রমণ করলে কাশি, হাঁচি, গলাব্যথা, সর্দি বা ঠাসা নাক, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এগুলো সাধারণ সর্দি-কাশির মতো হালকা অসুস্থতা থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো আরও গুরুতর অবস্থা পর্যন্ত হতে পারে।
সংক্রমণ শ্বাসযন্ত্রের উপরের অংশে হলে ফ্যারিঞ্জাইটিস ও ল্যারিঞ্জাইটিসের মতো সমস্যা দেখা যায়। ফ্যারিঞ্জাইটিসে গলার পেছনের অংশে প্রদাহ হয়; অন্যদিকে ল্যারিঞ্জাইটিসে স্বরযন্ত্রে প্রদাহের কারণে গলা ভেঙে যেতে পারে বা স্বর বসে যেতে পারে। সংক্রমণ শ্বাসনালির আরও নিচের দিকে পৌঁছালে ব্রঙ্কাইটিস হতে পারে। আর ফুসফুসের বায়ুথলিতে সংক্রমণ ছড়ালে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া।
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক সবসময় প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণই ভাইরাসজনিত—সাধারণ সর্দি যেমন। গলাব্যথা বা জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন নেই; ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তবে স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে স্ট্রেপ থ্রোট হতে পারে; পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয়।
সংক্রমণ ফুসফুসে পৌঁছালে নিউমোনিয়া হতে পারে। জ্বর, কাশি, কফ, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতা এর পরিচিত উপসর্গ। বুকের এক্স-রে করলে ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে সাদা ছোপ বা ছায়া দেখা যেতে পারে। তবে শুধু এক্স-রে নয়, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য পরীক্ষার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা হয়।
সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।
সর্দি, কাশি ও জ্বর একাধিক সংক্রমণের সাধারণ উপসর্গ হওয়ায় শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নির্দিষ্ট করা কঠিন। কাশি বুকের গভীর থেকে উঠছে কি না, শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে কি না এবং জ্বর কতদিন থাকছে—এসব খেয়াল করা জরুরি।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বুকের এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা কিংবা নির্দিষ্ট ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করার পরীক্ষা করাতে পারেন। বায়োফায়ার প্যানেলের মতো মলিকিউলার পরীক্ষায় একসঙ্গে একাধিক রোগজীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব। এতে সংক্রমণের কারণ বুঝে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
প্রতিরোধের মূল কথা হলো ভালো স্বাস্থ্যবিধি, টিকাদান ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার সমন্বয়। নিয়মিত হাত ধোয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়ানো, টিকা হালনাগাদ রাখা এবং সুষম খাদ্য বজায় রাখা—সবই সুস্থ শ্বাসযন্ত্রে অবদান রাখে।
দৈনন্দিন অভ্যাসেও সুরক্ষা মেলে: পর্যাপ্ত পানি পান করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি; ধূমপান এড়িয়ে চলতে হবে। বাইরে বের হলে প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করতে হবে—বিশেষ করে ভিড় বা বদ্ধ জায়গায় মাস্ক সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসও বজায় রাখতে হবে।
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, সিওপিডির রোগী এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লু ভ্যাকসিন সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি অসুখের তীব্রতা ও জটিলতার আশঙ্কাও কমাতে পারে।


