মিরপুরে পোশাকশ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বন্ধ মেট্রোরেলের তিন স্টেশন

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। উত্তেজনার মধ্যে যাত্রী নিরাপত্তার কারণে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। একই সময়ে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায়ও সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চলছিল। পুলিশ আন্দোলনকারীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে গিয়ে অবস্থান নেন। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলা এই বিক্ষোভ টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ। উত্তরা-মতিঝিল রুটে ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকলেও এই তিনটি স্টেশনে কোনো ট্রেন থামেনি। এমআরটি পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ মিরপুর-১১ স্টেশনের কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, পরিস্থিতি সহিংস আকার ধারণ করায় যাত্রী ও স্টেশনের সার্বিক সুরক্ষার জন্যই বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে স্টেশনটি আবার সচল করা হবে।
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সড়কে অবস্থানের কারণে যান চলাচল একপ্রকার বন্ধ হয়ে পড়ে, এতে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। পুলিশ আন্দোলনরত শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হোক — বর্তমান মজুরির দ্বিগুণেরও বেশি। গত কয়েক দিন ধরে মিরপুর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিকরা এই দাবিতে আন্দোলন করছেন।
এর আগে রোববার রাজধানীর উপকণ্ঠে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের জামগড়া এলাকায় বিক্ষোভে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং কয়েক ডজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানায়, রোববারের বিক্ষোভে ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। ওই দিনই সরকার শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়।
সোমবার মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকরা টানা তৃতীয় দিনের মতো সড়কে নামেন। সেদিন গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা, কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, আর পাশের মিরপুর এলাকা থেকেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর আসে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের একজন ঢাকার কাছের ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেড কারখানার অভিজ্ঞ সেলাই অপারেটর লাইলী বেগম (৩৭)। তিনি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেন, ওভারটাইম করলে তা কখনো ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় ওঠে। এই আয়ে সংসার চালাতে না পেরে চলতি বছরের শুরুতেই তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ও ১২ বছর বয়সী ছেলেকে স্কুল ছাড়াতে হয়েছে। তিনি জানান, তাঁদের কোনো কোনো দিন একবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না; এক সকালে শুধু মুড়ি আর একটি শুকনো নাশতা খেয়েই দিন কেটেছে, দুপুরে কিছুই ছিল না।
লাইলী বেগম মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ঘরে থাকেন, যার ভাড়া মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সিরাজগঞ্জ জেলার গ্রামের বাড়িতে থাকা তাঁর বাবাও এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা দামের গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে না পেরে তিনি ফেলে দেওয়া কাগজ ও অন্যান্য উপকরণ পুড়িয়ে রান্না করেন। তাঁর ভাষায়, সরকার শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়; কবে ও কতটা মজুরি বাড়বে, তা জানায়নি। তিনি বলেছেন, মজুরি বাড়তেই হবে, তবে খাদ্যের দামও কমাতে হবে।
আশুলিয়ার শ্রমিক রাসেল খান (৩০) ওভারটাইমসহ মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন, যা দিয়ে মা, ছোট ভাই, স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবার চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান। জীবনযাত্রার খরচ বাড়তে থাকায় সংসার চালাতে তাঁকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দাম বাড়তেই থাকছে, আর বেঁচে থাকতেই টাকা ধার করতে হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আশ্বাস দেন, আলোচনার মাধ্যমেই নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে। শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মজুরি বোর্ড শিগগিরই আলোচনা শুরু করবে।
অন্যদিকে মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার দাবি করেছেন, নতুন মজুরি ২০২৭ সালের জানুয়ারির বেতন থেকেই কার্যকর করতে হবে। তিনি বিক্ষোভকারীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি ও তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, তৈরি পোশাক খাতে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি সংশোধন হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর শ্রম আইন সংশোধন করে মজুরি পর্যালোচনার চক্র পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, আর বর্তমান তিন বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ — খাদ্যে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসাইন বলেন, গত পাঁচ বছরের টানা মূল্যস্ফীতি স্বল্প বেতনের শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা তীব্রভাবে কমিয়ে দিয়েছে; প্রকৃত আয় কমে গেলে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় থাকে না, কারণ তাঁদের কোনো উদ্বৃত্ত আয় নেই। তিনি বলেন, প্রশ্ন মজুরি সমন্বয় করা হবে কি না তা নয়, বরং কতটা করা হবে — আর এজন্য শ্রমিক, মালিক ও সরকারকে নিয়ে অবিলম্বে আলোচনা দরকার।
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ পোশাক কারখানা শ্রমিক কাজ করেন, যাঁদের অর্ধেক নারী। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ; এই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়, যা গত অর্থবছরে ৩৯ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছিল। তুলনামূলকভাবে কম্বোডিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মাসে ২১০ ডলার, ভিয়েতনামে ১৪০ থেকে ২১০ ডলার, আর চীনের উৎপাদন কেন্দ্র গুয়াংডংয়ে ২৮৬ থেকে ৩৭৮ ডলার।
বিজিএমইএ কর্মকর্তা ও কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজ বলেন, শ্রমিকরা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি পাওয়ার যোগ্য; তবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ন্যায্য ক্রয়মূল্য ছাড়া বড় মজুরি বৃদ্ধি কারখানাগুলোর ওপর চাপ ফেলতে পারে এবং কর্মসংস্থান হুমকিতে ফেলতে পারে। তাঁর মতে, টেকসই মজুরি বৃদ্ধি কেবল প্রস্তুতকারকদের একার পক্ষে সম্ভব নয় — ন্যায্য মূল্য ও দায়িত্বশীল ক্রয়-আচরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।




