…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
জাতীয়

নেত্রকোণার দুর্গাপুর-কলমাকান্দা সীমান্তে মাদকের ১০-১২টি পথ, এক বছরে ৫১১ মামলায় গ্রেপ্তার ৬৯৫ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নেত্রকোণার দুর্গাপুর-কলমাকান্দা সীমান্তে মাদকের ১০-১২টি পথ, এক বছরে ৫১১ মামলায় গ্রেপ্তার ৬৯৫ জন
ছবি: সংগৃহীত

সীমান্ত জেলা নেত্রকোণায় রাতের আঁধারে মাদক ঢুকছে সীমান্ত পেরিয়ে। কখনো মাথায় করে, কখনো মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, অটোরিকশা কিংবা অন্য যানবাহনে আনা এসব মাদক কয়েক দফা হাতবদল হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে, সেখান থেকে সড়কপথে ছড়িয়ে পড়ছে নেত্রকোণা শহর এবং ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়।

জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে নিয়মিত মাদক উদ্ধার ও বাহক গ্রেপ্তার হলেও চোরাচালান থামছে না; একটি চালান আটক হওয়ার কিছুদিন পরই একই এলাকায় নতুন চালান আসার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জেলা পুলিশের তথ্য, মাদক মামলার নথি, বিজিবির উদ্ধারসংক্রান্ত তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নেত্রকোণায় ৫১১টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৯৫ জন। একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে ২৯ হাজার ৮৭৪ পিস ইয়াবা, ৮৩৮ পিস ট্যাপেন্টাডল, ২১ দশমিক ৯৮ গ্রাম হেরোইন, ২২০ কেজি গাঁজা, ৬১১ লিটার চোলাই মদ, ৬৩১ অ্যাম্পুল ইনজেকশন, এক হাজার ৬০৮ বোতল ভারতীয় মদ, এক হাজার ১০০ বোতল ওয়াস, ২৬ বোতল ফেনসিডিল ও ৩০টি গাঁজাগাছ।

পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে কলমাকান্দা থানায় ৪২টি মামলায় ৭৩ জন এবং দুর্গাপুর থানায় ৪০টি মামলায় ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার প্রায় ৯২ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দুর্গম ও জনবসতিহীন। এসব এলাকায় মাদক ও চোরাচালানি পণ্য প্রবেশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি পয়েন্টের তথ্য পাওয়া গেছে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। উল্লেখযোগ্য পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্গাপুর সদর ইউনিয়নের ভবানীপুর, বারমারী, লক্ষ্মীপুর, ভরতপুর ও মেনকি ফান্দা, কুল্লাগড়া, বিজয়পুর এবং কলমাকান্দার নাজিরপুর, রংচাতি, লেংগুড়া, খারনৈ ও পাঁচগাঁও এলাকা। প্রায় ৯২ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারায় বিজিবির সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি রয়েছে মাত্র ১০টি; ফলে দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তের সব অংশে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা কঠিন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাতের আঁধারে এসব পয়েন্ট দিয়ে মাদকসহ বিভিন্ন পণ্য প্রবেশ করে। সীমান্ত পার হওয়ার পর চালান সরাসরি দূরের গন্তব্যে না নিয়ে প্রথমে রাখা হয় গুদাম, বসতবাড়ি কিংবা নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে। পরে সুযোগ বুঝে ছোট ছোট চালানে সেগুলো দেশের ভেতরে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপার থেকে মাদক নিয়ে আসা ব্যক্তি সাধারণত পুরো চালান নিয়ে দূরের গন্তব্যে যান না। সীমান্তের কাছাকাছি এসে তিনি প্রথমে অন্য একজনের হাতে চালান তুলে দেন; এরপর কয়েক দফা তা হাতবদল হয়। কেউ বহন করে, কেউ পাহারা দেয়, কেউ পরিবহনের ব্যবস্থা করে, আবার কেউ মজুত রাখে। ফলে চালানের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা বাহকের সঙ্গে মূল কারবারির সরাসরি যোগাযোগ থাকে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে তাই অনেক ক্ষেত্রে বাহক ধরা পড়লেও নেপথ্যের অর্থদাতা, স্থানীয় সমন্বয়কারী কিংবা মূল সরবরাহকারীদের শনাক্ত করা যায় না।

সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন সড়ক। স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী সম্ভাব্য রুটগুলোর একটি হলো সীমান্ত থেকে ভবানীপুর বা বারমারী হয়ে দুর্গাপুর পৌর শহর, পরে বিরিশিরি-শ্যামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে নেত্রকোণা বা ময়মনসিংহ। আরেকটি রুট বিজয়পুর থেকে কুল্লাগড়া ও ধোবাউড়া হয়ে ময়মনসিংহ বা ঢাকা; তৃতীয়টি সীমান্ত থেকে নাজিরপুর বা লেংগুড়া হয়ে কলমাকান্দা, পরে নেত্রকোণা শহর হয়ে ময়মনসিংহ বা ঢাকা। মাদক ও চোরাচালান পণ্য পরিবহনে পিকআপ, ট্রাক, বাস, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহারের তথ্য রয়েছে; কিছু যানবাহন বিশেষভাবে পরিবর্তন করে ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। কুল্লাগড়া এলাকার চালান ধোবাউড়া-ময়মনসিংহ সড়ক দিয়েও পরিবহনের তথ্য মিলেছে।

সীমান্তপথে শুধু মাদক নয়, বিভিন্ন ভারতীয় পণ্যও চোরাইপথে দেশে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডলের পাশাপাশি কম্বল, প্রসাধনসামগ্রী, ব্লেড, চিনি, ওষুধ ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।

২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কলমাকান্দার মধুকুড়া এলাকায় ১৪৯ বোতল ভারতীয় মদ, একটি মোটরসাইকেল ও দুটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান জব্দ করে বিজিবি। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও কলমাকান্দার কাঁঠালবাড়ী এলাকায় ১০৫ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে কলমাকান্দার খারনৈ এলাকায় ৪৭ বোতল ভারতীয় মদ মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করে বিজিবি। ২০২৬ সালেও দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্তে মালিকবিহীন ভারতীয় মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্ত পার করে আনা মাদক কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং মালিকবিহীন অবস্থায় মাদক উদ্ধারের পর প্রকৃত মালিক কিংবা অর্থদাতারা কতটা শনাক্ত হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালানে একাধিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কলমাকান্দাকেন্দ্রিক একটি চক্র সীমান্ত থেকে মাদক সংগ্রহ করে অন্য একটি পক্ষের কাছে পৌঁছে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আরেকটি চক্র দুর্গাপুরের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক সংগ্রহ করে নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় সরবরাহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পরিবহনকেন্দ্রিক একটি নেটওয়ার্কের তথ্যও পাওয়া গেছে, যার কাজ সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক ও চোরাচালান পণ্য জেলা শহরের কাছাকাছি নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া।

সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদক শুধু সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কলমাকান্দার গুজাগলিয়া ফায়ার সার্ভিস এলাকা, পূর্ববাজার ড্রেইনপাড়, সিলহালা মোড় ও মনতলা হাসপাতাল এলাকা এবং দুর্গাপুরের দক্ষিণপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, মোক্তারপাড়া ও সদর ইউনিয়নের মাকরাইল আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দোকানদার জানান, বাইরে থেকে কিছু যুবক এসে দ্রুত লেনদেন করে চলে যায়; পুলিশ এলে তারা সরে পড়ে, পরে আবার একইভাবে আসে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক বলেন, সীমান্তপথে যেসব রুট দিয়ে মাদক পরিবহন করা হয়, সেগুলোতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জেলাকে মাদকমুক্ত করতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। নেত্রকোণার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম জানান, নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, সীমান্ত এলাকায় সব সময় নজরদারি রয়েছে এবং তথ্য পাওয়া মাত্রই বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

গাজীপুরে নাওজোর ফ্লাইওভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিজিবি সদস্য আহত; ছুটির কারখানা বেড়ে ২৫০
জাতীয়

গাজীপুরে নাওজোর ফ্লাইওভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিজিবি সদস্য আহত; ছুটির কারখানা বেড়ে ২৫০

গাজীপুর মহানগরের নাওজোর এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছেন বিক্ষুব্ধ পোশাকশ্রমিকেরা। এছাড়া শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘা…

গাজীপুরে কোনাবাড়ী থেকে পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত অবরোধ, মিরপুর-১০-এ টিয়ারশেল; সচিবালয়ে মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জাতীয়

গাজীপুরে কোনাবাড়ী থেকে পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত অবরোধ, মিরপুর-১০-এ টিয়ারশেল; সচিবালয়ে মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে কয়েক দিন ধরে চলা আন্দোলনে সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্…

পোশাকশিল্পে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে ধামরাইয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিকদলের বিক্ষোভ মিছিল
জাতীয়

পোশাকশিল্পে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে ধামরাইয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিকদলের বিক্ষোভ মিছিল

দেশের পোশাকশিল্প খাতে চলমান নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকার ধামরাইয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিকদলের …

গাজীপুরে তিন ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছাড়লেন পোশাকশ্রমিকরা, যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও থমথমে শিল্পাঞ্চল
জাতীয়

গাজীপুরে তিন ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছাড়লেন পোশাকশ্রমিকরা, যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও থমথমে শিল্পাঞ্চল

গাজীপুরে তিন ঘণ্টা অবরোধের পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছেড়ে দিয়েছেন পোশাকশ্রমিকরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও সতর্কতার মুখে মঙ্গলবার (…