পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে অস্থিরতার ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সরকারের, ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি যৌক্তিক বললেন তাসলিমা

পোশাক খাতের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই অস্থিরতা সৃষ্টির এমন চেষ্টা চলতে পারে। তবে যেকোনো মূল্যে এসব অপচেষ্টা সরকার রুখে দেবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি মন্তব্য করেন, এ ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা কেবল আসন্ন ডিসেম্বরকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়।
অন্যদিকে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে যৌক্তিক বলে মনে করেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে, এবং এই দাবি মোটেও বেশি নয়।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি সরকারও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনা করা হলেও শ্রমিকদের বাস্তব সংকট বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে বলে জানান তিনি। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির ইতিবাচক সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
তাসলিমা আক্তার বলেন, আইন অনুযায়ী তিন বছর পরপর শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের জীবন ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলে তা বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং শ্রমিকদের জীবনযাপন কিছুটা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে রাজপথে যে সহিংস রূপ দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই সাধারণ মেহনতি শ্রমিকদের আচরণ হতে পারে না বলে দাবি করেছেন তথ্য উপদেষ্টা। তাঁর ভাষায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী এ ধরনের নৈরাজ্যের নেপথ্যে সীমান্তের ওপার থেকে আসা ইন্ধন রয়েছে।
একই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাসলিমা আক্তারও। সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় তিনি শ্রমিকদের আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানবিরোধী হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন পক্ষকে এ আন্দোলন নিয়ে নানা মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে, এবং বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ও সেসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তাঁরা লক্ষ্য করছেন। তাঁর ভাষায়, শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করেন, তখন তাঁরা কারখানায় আগুন দেন না।
আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, একটি সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে নেমে কোনো কিছু করার সক্ষমতা দলটির আর অবশিষ্ট নেই। তবে তাদের কাছে সঞ্চিত থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থের জোরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে। ডিসেম্বরের সঙ্গে এই তৎপরতার সরাসরি কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হলেও শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত এ ধরনের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকবে বলে তিনি জানান।
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৌশল প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন, অতীতের মতো বলপ্রয়োগ বা দমনপীড়নের মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় না। রাজপথে থাকা তরুণরাও দেশের নাগরিক উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব সীমিত রেখে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাধানের পথে এগোচ্ছে প্রশাসন। পুলিশকে আইনানুগভাবে এবং সংঘাতের মাত্রা অনুযায়ী ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তাসলিমা আক্তারও দমন-পীড়নের বিরোধিতা করেছেন। চলমান আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ ও শ্রমিকদের আহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দমন, গ্রেপ্তার ও হয়রানি করে সমস্যার সমাধান হবে না। শ্রমিকরা তখনই আন্দোলনে নামেন, যখন তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। তাই দমন-পীড়নের পরিবর্তে শ্রমিকদের দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
মজুরি বোর্ড নিয়ে তাসলিমা বলেন, শ্রমিকদের গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করে দাবি জানানোর অধিকার রয়েছে। মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে, সেখানে শ্রমিকরা তাঁদের দাবি তুলে ধরবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে বোর্ডের কার্যক্রম শেষ করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয় বলে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি বোর্ডকে দ্রুত কার্যক্রম শেষ করে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করার আহ্বান জানান তিনি। মজুরি বোর্ড দ্রুত গঠনের দাবিতে তাঁরা আগে থেকেই আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন এবং বোর্ডের সদস্য কারা হতে পারেন, সে বিষয়েও তাঁদের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
বিদেশি ক্রেতাদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তাসলিমা আক্তার। তাঁর অভিযোগ, বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে কম দামে পোশাক কিনতে চান, অথচ পোশাকের মুনাফার বড় অংশ তারাই নিয়ে যান। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, দেশের পোশাকশিল্পের সংকট সমাধানে শুধু সরকার ও মালিকপক্ষের দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, বিদেশি ক্রেতাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় ফিরে আসুন কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে ফেরত আনা হোক—সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাঁকে দেশের মাটিতে এনে বিচারের মুখোমুখি করা। তবে তাঁর পাসপোর্টসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা ট্রাভেল পাস ইস্যুর বিষয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে তিনি বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।




