উইসকনসিনে ছোট ব্যবসার সংকটে কাঁপছে ট্রাম্প-মিত্রের আসন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে নজর ও ক্লেয়ারে

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ও ক্লেয়ার শহরে ১৮ বছর ধরে হাতে তৈরি কারুপণ্যের বাজার ‘ট্যাঙ্গলড আপ ইন হিউ’ চালিয়ে আসছেন এরিন ক্লাউস। এই বছরের শেষে তিনি দোকানটির সামনের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় আর ছোট ব্যবসার এই সংকটই এখন পশ্চিম উইসকনসিনের তৃতীয় কংগ্রেসনাল জেলার প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ক্লাউস দোকানটি খুলেছিলেন অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে, যখন শহরের কেন্দ্রস্থল ছিল অনেকটা জনশূন্য। নির্মাণকাজের ভোগান্তি আর মহামারির সময় পেরিয়ে টিকে থাকলেও গত দুই বছরে তাঁর বিক্রি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। কর্মীদের বেতন দিতে তাঁকে নিজের অন্য চাকরি থেকে পকেটের টাকা ঢালতে হয়েছে; তিনি স্থানীয় ব্যবসা সংগঠন ডাউনটাউন ও ক্লেয়ার ইনকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।
ক্লাউস বলেন, ‘এই প্রথমবার ব্যবসাটা বাঁচানো আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আমাদের অনেক ছোট ব্যবসায়ীর কাছেই পরিস্থিতি এখন খুবই হতাশাজনক। শুল্কযুদ্ধ থেকে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা — দিন শেষে সাধারণ মানুষের হাতে আর কোনো টাকাই থাকে না, আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চালানো ব্যবসাগুলোও আর টিকে থাকতে পারছে না।’
ও ক্লেয়ার যে তৃতীয় জেলায় অবস্থিত, সেখানে রিপাবলিকান বর্তমান প্রতিনিধি ডেরিক ভ্যান অর্ডেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অবস্থান ধরে রেখে প্রশাসনের রেকর্ডের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা কুক এই আসনে তৃতীয়বারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক হতাশার কথা তুলে ধরছেন।
ক্লাউসের ক্ষেত্রে টি-শার্টের ওপর শুল্কের বাড়তি খরচ তাঁকে নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের (অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট) বাজারের স্বাস্থ্য ভর্তুকি বাড়ানো হয়নি, আর শহরের কেন্দ্রে চালু হওয়া অর্থপ্রদত্ত পার্কিং কর্মসূচি তাঁর কাছে শেষ ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা থেকে মনে হয় এসব অর্থনৈতিক অবস্থা ঘটছেই না, কিংবা তাঁর মতো মানুষকে তা ভোগাচ্ছে না — যা তাঁর কাছে উপহাসের মতো শোনায়। তিনি জানেন, ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনি একা নন।
চিপ্পেওয়া ফলসের ‘ওয়ান অব আ কাইন্ড ইন্টেরিয়র ডিজাইন’-এর মালিক অ্যামি বার্ক লেপার দুই দশকের বেশি সময় ধরে কানাডার একজন ক্যাবিনেট নির্মাতার সঙ্গে কাজ করছেন; এখন সেই ক্যাবিনেটগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক বসেছে। খরচের কারণে তাঁর কয়েকজন গ্রাহক বাড়ি নির্মাণ পিছিয়ে দিয়েছেন, আর তাঁর খুচরা দোকান ‘লাগোম’-এ বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে গেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বার্ক লেপার জানান, জীবনে এই প্রথম তাঁর কোনো স্বাস্থ্যবিমা নেই। তাঁর ও তাঁর স্বামীর বিমার খরচ মাসে ১ হাজার ডলারের বেশি থেকে বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। তিনি ব্যবসা বন্ধ করছেন না, তবে ফেডারেল নীতি ছোট ব্যবসাগুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করছে তা মানুষকে বোঝাতে তিনি নিজের সংগ্রামের কথা প্রকাশ্যে বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দাম বেশি হওয়ার কারণ যাদু নয় — এসব নীতির ফলেই তা হচ্ছে।
এই জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসও মিশ্র। ভ্যান অর্ডেনের ২০২২ সালের জয়ের আগে ডেমোক্র্যাট রন কাইন্ড ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আসনটি ধরে রেখেছিলেন। মূলত গ্রামীণ ও শহরতলির এই জেলা বারাক ওবামাকে দুবার সমর্থন করেছে, তারপর ট্রাম্পকে তিনবার, আবার কখনো ব্যালটের অন্য পদে ডেমোক্র্যাটদেরও ভোট দিয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কয়েক কোটি ডলারের বাইরের অর্থ ব্যয় হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেদের রেকর্ডের পক্ষে প্রচারে একাধিকবার এই জেলায় এসেছেন, আর ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের বলেছেন, এবার যেন তারা ধরে নেয় তিনিই ব্যালটে আছেন। ভ্যান অর্ডেন ইরান যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেছেন, যদিও স্বীকার করেছেন এটি রিপাবলিকানদের হাউস ও সিনেট ধরে রাখাকে ‘গাণিতিকভাবে অনেক কঠিন’ করে তুলছে। এই সপ্তাহে রিপাবলিকান হাউস স্পিকার মাইক জনসন তাঁর সঙ্গে সমাবেশ করে তাঁকে ‘আমাদের লড়াকুদের একজন’ বলেছেন। ভ্যান অর্ডেন এক প্রতিবেদককে বলেছেন, ট্রাম্প এই জেলায় টানা তিনবার জিতেছেন, প্রতিবারই ব্যবধান বেড়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত নেভি সিল ভ্যান অর্ডেন প্রতিদ্বন্দ্বী কুককে ‘দ্য ক্রুকড ওয়ান’ বলে উল্লেখ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও পোস্ট করেছেন এবং স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে কুকের সমাবেশকে ‘ককটেল কমিউনিস্ট’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর আগের আচরণও আলোচনায় এসেছে — ২০২১ সালে প্রাইড মাসের প্রদর্শনী নিয়ে এক কিশোর গ্রন্থাগারকর্মীকে হুমকি, ২০২৩ সালে মার্কিন ক্যাপিটলে সিনেট পেজদের উদ্দেশে চিৎকার এবং ২০২৪ সালের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে জো বাইডেনের উদ্দেশে ‘মিথ্যা’ বলে চিৎকার। সাক্ষাৎকার বা মন্তব্যের অনুরোধে তিনি সাড়া দেননি।
কুক নিজেও জেলার ভোটারদের অর্থনৈতিক হতাশার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল তুলে ধরছেন। তিনি একটি দুগ্ধ খামারে বড় হয়েছেন; দুধের কম দাম ও বড় ডেইরিগুলোর প্রতিযোগিতায় তাঁর পরিবারকে গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। তিনি ও ক্লেয়ারে একটি ছোট ব্যবসা চালিয়েছেন এবং এখনো ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেন; একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন, যা দিয়ে ভ্যান অর্ডেন তাঁর শ্রমজীবী পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করছেন। তিনি মধ্যপন্থী ব্লু ডগ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তবে স্যান্ডার্সের সমর্থন পেয়েছেন এবং অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তাবাদী ধারণা নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।
কুকের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের কর ক্রেডিট ভর্তুকি আরও তিন বছরের জন্য বাড়িয়ে ‘রক্তক্ষরণ বন্ধ করা’, স্বাস্থ্যসেবায় পাবলিক অপশন চালু করা এবং দৃষ্টি, দন্ত ও শ্রবণ সেবা অন্তর্ভুক্ত করতে মেডিকেয়ার সম্প্রসারণ। তাঁর ভাষায়, ইরান যুদ্ধ ‘শেষ হতেই হবে’, যা দাম কমাতে সাহায্য করবে। তিনি অ্যান্টিট্রাস্ট আইন প্রয়োগ করে বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দেওয়ার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গ্রাহকদের নজরদারি করে ভিন্ন ভিন্ন দাম নির্ধারণকারী কোম্পানিগুলোকে থামানোর কথাও বলেছেন। যে রেস্তোরাঁয় তিনি কাজ করেন, সেখানে মানুষের হাতে ব্যয় করার টাকা না থাকায় বাইরে খেতে আসা কমে গেছে; কোভিড-কালীন ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁকে নিজের বিমাও ছাড়তে হয়েছে। উল্লেখ্য, ভ্যান অর্ডেন ছিলেন অল্প কয়েকজন রিপাবলিকানের একজন, যিনি ওই ভর্তুকি বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
কুক বলেন, ‘মনে হয় কেউই আসলে পরোয়া করে না। আর আমি এসব কথা বলতে পারি, কারণ আমি বুঝি — আমি সবার সঙ্গে একই লড়াইয়ের ময়দানে আছি।’ তিনি ছোট শহরের ডেইরি প্রাতরাশ, লুটেফিস্ক মধ্যাহ্নভোজ, কাউন্টি মেলা আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। ২০২২ সালে তিনি সাত পয়েন্টে হেরেছিলেন, ২০২৪ সালে ব্যবধান ছিল তিন পয়েন্টেরও কম। তাঁর ভাষায়, ‘বড় নীল ঢেউ এলেও এখানে তা হবে ছোট্ট একটি ঢেউ মাত্র।’
তবে নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ক্লাউসের জন্য তা দেরি হয়ে যাবে। ‘ট্যাঙ্গলড আপ ইন হিউ’ বছরের শেষ পর্যন্ত খোলা থাকবে, যাতে দোকানের পণ্য বিক্রি হয় এবং সেখানে পণ্য বিক্রি করা কয়েক ডজন শিল্পী ছুটির মৌসুমে কিছু আয় করতে পারেন। শনিবারের শিল্প বাজার, পাইকারি অংশ আর পোশাক ছাপার কাজসহ ব্যবসার অন্যান্য অংশ তিনি চালু রাখবেন। নিজে ডেমোক্র্যাট ক্লাউস কংগ্রেসে কুককে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন; তবে তাঁর মতে, আসন বদলালেই সব অর্থনৈতিক কষ্ট সঙ্গে সঙ্গে দূর হবে না — ‘সামনে দীর্ঘ পথ, ৩ নভেম্বরের পরই সব শেষ হয়ে যাবে না।’




