'লোভ সামলাতে পারিনি, ক্ষমা চাই'—জবানবন্দিতে বললেন 'সমন্বয়ক' রিয়াদ, ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

'আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।' সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আহম্মেদের বাসায় গিয়ে চাঁদা দাবি ও টাকা আদায়ের মামলায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির শেষ দিকে এ কথা বলেছেন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ।
অভিযোগ অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে রিয়াদ সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করতেন।
শাম্মি আহম্মেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ লাখ টাকা আদায়ের এই মামলায় রিয়াদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ মুন্সী আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মঙ্গলবার আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১০ নভেম্বর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
অভিযোগপত্রের অন্য আসামিরা হলেন জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন এবং একজন শিশু। মামলার ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে আছেন। তাদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে রিয়াদ চাঁদার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে 'ফ্যাসিবাদী লোকজন' গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
জবানবন্দিতে রিয়াদ বলেন, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই রাতে শাম্মি আহমেদ গুলশানের বাসায় আছেন—এমন খবর পেয়ে তারা থানায় যান। পরে পুলিশের একটি দল তাদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালায়। সেখানে শাম্মিকে পাওয়া যায়নি। বাসা থেকে ফেরার সময় জানে আলম অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন, যেটিতে 'শাম্মি ইয়ারপড' লেখা ছিল। সেটি ফেরত দেওয়ার জন্য তারা পরদিন সকাল ১০টার দিকে আবার ওই বাসায় যান। অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে বাসার ভেতরে ঢোকেন।
এরপর বাদীকে বলা হয়, তারা বুঝতে পারছেন তার স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে। বাদী টাকা দিতে রাজি হলে প্রথমে ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। বাদী ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তারা তাতে রাজি হন। পরে ওই টাকা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করে নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন রিয়াদ।
বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়ে রিয়াদ বলেন, ২৬ জুলাই বিকেল পাঁচটার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে ওই বাসায় পাঠান। তার ভাষ্য, পুলিশ তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য বাসায় যেতে বলে; পুলিশের কথা বিশ্বাস করে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বাদী থানায় খবর দেন। পুলিশ এসে তাদের হাতেনাতে আটক করে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী পরিচয় দিয়ে এ ধরনের চাঁদাবাজি করতেন। সমন্বয়ক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তারা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন এবং বিভিন্ন মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করতেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কে শাম্মি আহম্মেদের পরিবারের বাসায়। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন শাম্মি আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় অভিযান চালান আসামিরা। তাকে না পেয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পর আসামিরা আবার ওই বাসায় গিয়ে শাম্মির স্বামীকে 'আওয়ামী লীগের দোসর' আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং পরে ১০ লাখ টাকা আদায় করেন। কয়েক দিন পর ২৬ জুলাই বিকেলে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে ওই বাসায় গেলে বাদী গুলশান থানায় খবর দেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। পরে গ্রেফতার হন জানে আলম অপু।
রিয়াদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আগে আলোচনা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য হন। গ্রেফতারের পর তাকে সংগঠনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
রিয়াদের নিজ জেলা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নেও তার গ্রেফতারের খবরে আলোচনা শুরু হয়েছিল। স্থানীয়দের ভাষ্যে, তার দাদা ওয়ালীউল্যাহ রিকশা চালাতেন; বাবা আবু রায়হানও আট বছর আগেও রিকশা চালাতেন, পরে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট রিয়াদের মা গৃহিণী ছিলেন এবং একসময় অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর তিনি কোম্পানীগঞ্জের সরকারি মুজিব মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন; পরে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে রিয়াদের মা সে সময় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তার ছেলে চাঁদাবাজি করতে পারে—তা তিনি বিশ্বাস করেন না; কেউ ষড়যন্ত্র করে তার ছেলেকে চাঁদাবাজ বানিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।




