ইউক্রেনে ত্রাণকেন্দ্র, হাসপাতাল ও বৃদ্ধনিবাসে রুশ হামলা, নিহত অন্তত ৩৮

গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ৩৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। হামলার লক্ষ্য ছিল একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র, একটি বৃদ্ধ রোগীদের নিবাস (হসপিস) এবং একটি হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটেছে জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের কোমিশুভাখা গ্রামে। সোমবার রাতে সেখানে গ্লাইড বোমা হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ধ্বংসাবশেষের নিচে ৫০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে।
জেলেনস্কি কোমিশুভাখা হামলাকে ‘এই যুদ্ধে রাশিয়ার চালানো সবচেয়ে বড় গণহত্যাগুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে খেরসন অঞ্চলে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছিল ইউক্রেন, যাতে সম্মুখসারির রুশ-অধিকৃত গ্রাম ওলেশকি থেকে মানুষজন সরে যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, কোমিশুভাখায় হামলাই ছিল মস্কোর জবাব।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা নিতে স্থানীয়রা একটি বিতরণ কেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন, ঠিক তখনই তিন হাজার কেজি ওজনের নয়টি আকাশ বোমা গ্রামটিতে আঘাত হানে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, হামলা শুরু হলে মানুষজন একটি স্কুলের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন, কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রের ছাদ ধসে পড়ে অনেকে নিচে চাপা পড়েন।
অঞ্চলটির প্রধান মিখাইলো সেমিকিন বলেছেন, ‘এই ট্র্যাজেডির মাত্রা বোঝা কঠিন।’ অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিট এবং এতে ২৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন।
তবে বিবিসি নিউজ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা প্রতিবেদক ইলিয়া আবিশেভের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই স্থানটি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ব্যবহার করছিল এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই এবং কোমিশুভাখা বসতিতে কোনো বড় সামরিক বা শিল্প স্থাপনাও নেই। গ্রামটি জাপোরিঝিয়া শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত; শহরটি ধারাবাহিক রুশ বোমাবর্ষণের মুখে রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন বলেছে, স্থানীয় স্কুলে মানবিক সহায়তা বিতরণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত ছিল এবং এই হামলা ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সবচেয়ে মৌলিক নীতিগুলো লঙ্ঘন করেছে বলে মনে হচ্ছে’। গত মাসে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ‘রেকর্ড পর্যায়ে’ পৌঁছেছে।
আরও উত্তরে দিনিপ্রো শহরে সোমবার রাতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রে একটি হসপিস ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখান থেকে প্রায় ৫০ জন মুমূর্ষু রোগীকে অন্য স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে; রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কজনের বয়স ৯০ বছর।
দিনিপ্রোর মেয়র বরিস ফিলাতভ টেলিগ্রামে ধ্বংসপ্রাপ্ত হসপিস কক্ষের ছবি প্রকাশ করেছেন, যেখানে বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া জানালা আর মেঝেজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ও ভাঙা কাচের মধ্যে বৃদ্ধ রোগীদের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, আমি নৈতিকতা লঙ্ঘন করছি। আমি চাই যত বেশি সম্ভব মানুষ এই ছবিগুলো দেখুক। বিশেষ করে রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকেরা। বিশেষ করে বিদেশে থাকা ব্যক্তিরা। এরা বৃদ্ধ, মুমূর্ষু মানুষ। এটা একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র।’
দিনিপ্রোতে আলাদা আরেকটি হামলায় দুজন নিহত ও ১৮ জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলে আকাশ বোমা ও ড্রোন হামলায় আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া রাশিয়া নয়টি অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যাতে পানি ও তাপ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। রাজধানী কিয়েভের প্রধান পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিয়েভভোদোকানাল জানিয়েছে, ‘শত্রুপক্ষের হামলা এবং রাজধানীর জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে’ শহরের পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার পুরো মেট্রো নেটওয়ার্কও স্থগিত ছিল এবং মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন।




