যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন টেক্সাসের ভোটাররা, খরচ ৫৭ কোটি ডলারের বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা এমন একটি সিনেট নির্বাচনে ভোট দিতে শুরু করেছেন, যা ইতিমধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোটের আগ পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো—দুজনের সমর্থনে সব মিলিয়ে অন্তত ৫৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার ঢালা হয়েছে।
এই অর্থের মধ্যে শুধু প্যাক্সটনের সমর্থনেই ধনকুবের ইলন মাস্কের কাছ থেকে এসেছে অন্তত ২১ কোটি ২০ লাখ ডলার। মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ঘাঁটি দক্ষিণ টেক্সাসে। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাস্ক সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে ১৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছেন, যার প্রায় পুরোটাই গেছে প্যাক্সটনকে সমর্থনে। পত্রিকাটি বলেছে, ‘ডার্ক মানি’ বা অঘোষিত ব্যয়ের কারণে মাস্কের মোট ব্যয়ের এই হিসাব সম্ভবত প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে কম। ট্রাম্পের মাগা ইনক প্যাকও প্যাক্সটনের সমর্থনে অন্তত ১ কোটি ডলার খরচ করেছে।
প্রচারণার তহবিল সংগ্রহে আবার প্যাক্সটনের চেয়ে এগিয়ে তালারিকো: তিনি তুলেছেন ১৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, প্যাক্সটন তুলেছেন ৪ কোটি ডলার। ফেডারেল আইনে ব্যক্তিগত দাতাদের কাছ থেকে তহবিল নেওয়ার সীমা রয়েছে এবং দাতাদের পরিচয় প্রকাশ করতে হয়।
এর বাইরে সুপার প্যাক নামে পরিচিত রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিগুলোর মাধ্যমে বিপুল অর্থ ঢুকেছে; এসব কমিটি কোনো প্রার্থীর সমর্থনে সীমাহীন অর্থ খরচ করতে পারলেও প্রচারণার সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করতে পারে না। এই বাইরের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্যাক্সটন। অন্যদিকে লোন স্টার রাইজিং প্যাক তালারিকোর পেছনে অন্তত ২ কোটি ১০ লাখ ডলার খরচ করেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগই এই নির্বাচনের মূল সুর, আর রেকর্ড ব্যয় নানা রাজনৈতিক মতের ভোটারকেই অস্বস্তিতে ফেলেছে। ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া ৪০ বছর বয়সী ইউনিয়ন শিট মেটাল কর্মী রিকো সানচেজ বলেন, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণেই তিনি ডেমোক্র্যাটদের বেছে নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই ধরনের অর্থ ভুল জায়গায় খরচ হচ্ছে।’
২১ বছর বয়সী কেসি ব্লাঙ্কো ব্যালট ভাগ করে দিয়েছেন—গভর্নর পদে রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে আর সিনেটে ডেমোক্র্যাট তালারিকোকে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটা একটু ভয়ের। রাজনীতিবিদরা খেলায় ঢুকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে কতটা চেষ্টা করছেন, তা দেখা যাচ্ছে।’ তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ‘জনগণের কাছ থেকে, জনগণের দ্বারা’ হওয়া উচিত।
মঙ্গলবার ভোট দেওয়া ৪৬ বছর বয়সী ভোটার মনিক ওরেলানা মাস্কের ব্যয় নিয়ে অস্বস্তির কথা জানান। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কাজ করুক ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করুক—এটাই তিনি চান। ট্রাম্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি যুদ্ধ শুরু করবেন না, কিন্তু করেছেন। বলেছিলেন প্রথম দিনেই মুদিপণ্যের দাম ঠিক করবেন; দাম উল্টো বেড়েছে।’
৫৮ বছর বয়সী ভোটার লুইস প্লাজাস নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নন; তবে তিনি অর্থনীতির উন্নতি ও ট্রাম্পের গণ-বিতাড়ন অভিযানে পরিবর্তন চান। তিনি রিপাবলিকানদের পুরো প্যানেলেই ভোট দিয়েছেন এবং বলেছেন, সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করেছে: ‘আমি একজন খ্রিস্টান, পরিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করি; মনে হয় রিপাবলিকানরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকেছে।’
সারা দেশের নজর টেক্সাসে থাকায় সোমবার গভীর রাতে দুই সিনেট প্রার্থীই শেষ আবেদন জানান। তালারিকো টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো তুলে ধরেন এবং মাস্কের ব্যয়কে সাধারণ ভোটারদের চেয়ে বড় অর্থের স্বার্থকে প্রাধান্যের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর প্রচারণায় বারবার উঠে এসেছে আন্ডারডগ আমেরিকান ফুটবল দলের গল্প নিয়ে তৈরি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ফ্রাইডে নাইট লাইটস’-এর প্রসঙ্গ।
তালারিকো জিতলে ১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে প্রথমবার কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যব্যাপী পদে জয়ী হবেন; দলটি দীর্ঘদিন ধরে ‘টেক্সাসকে নীল করার’ আশা করে আসছে। সান আন্তোনিও থেকে তালারিকো বলেন, ‘আমরা অসাধারণ কিছু করতে যাচ্ছি। আমরা ঐতিহাসিক কিছু করতে যাচ্ছি। আমরা বিলিয়নিয়ারদের চমকে দেব, বিশ্বকে চমকে দেব—যখন আমরা টেক্সাস ফিরে পাব।’
অন্যদিকে প্যাক্সটন তালারিকোকে টেক্সাসের আদর্শের বিপরীত হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিন দশক ধরে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা এই রাজ্যের কম কর ও কম নিয়ন্ত্রণের মডেল আর রক্ষণশীল সামাজিক নীতি রিপাবলিকানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্যাক্সটনের প্রচারণায় বারবার এসেছে ১৮৩৬ সালের টেক্সাস বিপ্লবের প্রসঙ্গ, যখন মেক্সিকোর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছিল।
কলিন কাউন্টির এক অনুষ্ঠানে প্যাক্সটন বলেন, ‘আমাদের প্রিয় সবকিছু—চাকরি, জীবিকা, টেক্সাসে আমাদের জীবনধারা—হারানোর এত কাছাকাছি আমরা আগে কখনো যাইনি। টেক্সাস যদি পড়ে যায়, যাওয়ার মতো আরেকটা টেক্সাস আমাদের নেই।’




