তাহসিফের মৃত্যু: টঙ্গীর মাঠে সেই রাতে কী ঘটেছিল, টহল পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। রিমান্ডে থাকা শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন মাঠে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হতে ওই রাতে দায়িত্বরত টহল পুলিশের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে তদন্তকারী দল। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, টঙ্গীর মাঠের বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর পিলারের সামনে বসে যখন তাহসিফ মাদক সেবন করছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে পুলিশের একটি টহল দল এসে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চারপাশের স্থানীয় মাদক কারবারিরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
একই সময়ে দীপও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকিয়ে থাকেন। দীপ রিমান্ডে জানিয়েছেন, মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের এই হুড়োহুড়ির মধ্যেই তাহসিফ ও তিনি আলাদা হয়ে যান।
তাহসিফের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন মাঠের সেই রাতের ঘটনা। নিখোঁজ হওয়ার রাতে ওই এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে টহল দলকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই রাতে মাঠের আশপাশে পুলিশের স্পষ্ট টহল ছিল। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশও স্বীকার করেছে, ওই এলাকায় ২৪ ঘণ্টা তাদের টহল দল দায়িত্ব পালন করে। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য এখন, সেই রাতে আসলে কোনো ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল কি না, অথবা পুলিশ দেখে তাড়াহুড়ো করে পালাতে গিয়েই তাহসিফ নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা।
এর আগে মৃত্যুর আগে তাহসিফ তার বান্ধবীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। এরপর তিনি তার জুনিয়র বন্ধু দীপকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার দিকে রওনা হন। ঘটনার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাজার বস্তির একটি গলি দিয়ে তাহসিফ ও দীপ তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। সে সময় স্থানীয় কয়েকজন নারী তাদের ওই এলাকায় যেতে নিষেধ করলেও তাহসিফ তা অগ্রাহ্য করে মাঠের দিকে এগিয়ে যান। এর আগে তাহসিফ, দিশা ও দীপ তিনজনে মিলে উত্তরার একটি মদের বারে যান এবং সেখানে তারা দেড় ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করেন।
তদন্তে এখন যেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে, দীপ ও তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার বারে থাকা বান্ধবী নিশাত তাসনিম দিশাকে নিয়ে কোনো বিরোধ হয়েছিল কি না, দীপ প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের ধাওয়ার কথা বললেও পরে কেন পুলিশের টহলের কথা বললেন, এবং তাহসিফ স্বেচ্ছায় নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি অসাবধানতাবশত পড়ে যান, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অপরাধচক্র জড়িত।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীপ ও দিশাকে উত্তরখান থানায় মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তারা রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে সবই তারা সত্য তথ্য দিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহও রয়েছে। এ কারণে দীপকে পুনরায় রিমান্ডে আনা হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার হয়। ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের সময় মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও নিশাত তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌপুলিশ।


