সর্দি নাকি অ্যালার্জি — হাঁচি, চুলকানি আর জ্বর দেখে যেভাবে বুঝবেন পার্থক্য
নাক দিয়ে পানি পড়া, বারবার হাঁচি আর চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে অনেকেই প্রথমে সর্দির ওষুধ খাওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু এসব লক্ষণের কারণ সব সময় মৌসুমি সংক্রমণ নয় — অনেক সময় যাকে সর্দি বলে মনে হয়, তা আসলে একটি অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া।
এই বিভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক, কারণ সর্দি ও অ্যালার্জি — দুটোতেই নাক ও শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হয়। তবে দুটি অবস্থার কারণ, স্থায়িত্বকাল এবং আনুষঙ্গিক লক্ষণ সম্পূর্ণ আলাদা। এই পার্থক্যগুলো বুঝতে পারলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা যায় এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়।
সাধারণ সর্দি হলো ঊর্ধ্ব শ্বাসতন্ত্রের একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যার কারণ হতে পারে ২০০টিরও বেশি ভাইরাস। সাধারণত প্রথম দুই-তিন দিন লক্ষণগুলো তীব্র থাকে এবং এরপর ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ সর্দি সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন স্থায়ী হয়।
অন্যদিকে অ্যালার্জি হয় তখন, যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন কোনো উপাদানের প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর মধ্যে রয়েছে ধুলিকণায় থাকা ক্ষুদ্র জীবাণু (ডাস্ট মাইট), পরাগরেণু, ছত্রাকজাতীয় অণুজীব (মোল্ড) এবং পোষা প্রাণীর গায়ের মৃত কোষ বা লোম। অ্যালার্জিক রাইনাইটিস ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে পারে, যতক্ষণ একজন ব্যক্তি সেই অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের সংস্পর্শে থাকেন। কোন উপাদানে অ্যালার্জি হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে লক্ষণ মৌসুমি হতে পারে, আবার সারা বছর ধরেও থাকতে পারে।
হাঁচির ধরন দেখেও পার্থক্য বোঝা সম্ভব। অ্যালার্জির ক্ষেত্রে প্রায়ই বারবার ও একটানা হাঁচি আসে, বিশেষ করে ধুলোবালি, পরাগরেণু বা পোষা প্রাণীর সংস্পর্শে এলে। নাক, গলা বা চোখে চুলকানি হওয়া অ্যালার্জির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। অন্যদিকে সাধারণ সর্দির ক্ষেত্রে গলাব্যথা, কাশি ও ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
নাক দিয়ে কী ধরনের নিঃসরণ হচ্ছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। বেশ কয়েক দিন ধরে জলীয় ও স্বচ্ছ তরল নিঃসরণ হতে থাকলে, বিশেষ করে তার সঙ্গে চুলকানি ও হাঁচি থাকলে, তা অ্যালার্জির লক্ষণ হতে পারে এবং অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের সংস্পর্শ থাকা পর্যন্ত এই নিঃসরণ চলতে পারে। সর্দির ক্ষেত্রেও নাক দিয়ে পানি পড়ে, তবে সংক্রমণের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শ্লেষ্মার ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই কেবল নিঃসরণ দেখে অ্যালার্জি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
জ্বর ও শরীরে ব্যথা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সাধারণত অ্যালার্জির কারণে জ্বর বা শরীরে ব্যথা হয় না; এই লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাল সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। তবে নাকের চুলকানি ও বারবার হাঁচির পাশাপাশি চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা চোখ দিয়ে পানি পড়া অ্যালার্জিক কনজাংটিভাইটিসের লক্ষণ হতে পারে। লক্ষণ কখন দেখা দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ — ঘর পরিষ্কার করার সময়, ধুলোবালিযুক্ত স্থানে গেলে, পোষা প্রাণীর সংস্পর্শে থাকলে বা বছরের নির্দিষ্ট কোনো সময়ে বারবার লক্ষণ দেখা দিলে তা পরিবেশগত অ্যালার্জির ইঙ্গিত হতে পারে।
বারবার দেখা দেওয়া লক্ষণকে কেবল সাধারণ সর্দি ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। হাঁচি, নাক বন্ধ থাকা বা চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা ঘুম ও দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শুধু লক্ষণ দেখে অ্যালার্জি শনাক্ত করা সম্ভব নয়, কারণ এগুলোকে সহজেই ভাইরাল সংক্রমণ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতে পারে। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে, বিশেষ করে দুই সপ্তাহের মধ্যেও কোনো উন্নতি না হলে, অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বর থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন; লক্ষণ ও তার ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকেরা অ্যালার্জি পরীক্ষা বা মূল্যায়নের পরামর্শ দিতে পারেন। আর সাধারণ সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত নয়, কারণ ভাইরাল সংক্রমণের ওপর অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না।




