নওগাঁয় আগাম শীতকালীন সবজিতে কৃষকের লাভের আশা, বাজারে কমতে শুরু করেছে দাম
শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে নওগাঁর মাঠে মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে সবুজের সমারোহ। কোথাও সারি সারি ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা, কোথাও মাচাজুড়ে বেড়ে উঠছে শিমের লতা। আবার কোনো জমিতে বেগুন, মুলা ও পালংশাকসহ নানা জাতের শীতকালীন সবজির পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। মৌসুমের শুরুতেই বাজার ধরতে আগাম চাষাবাদে নেমেছেন তাঁরা। এরই মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে নতুন সবজি।
নওগাঁর কৃষিপ্রধান জনপদে এখন আগাম শীতকালীন সবজি ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য চলছে। জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও সেচ থেকে শুরু করে আগাছা পরিষ্কার ও রোগবালাই দমনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক। তাঁদের আশা, ফলন ভালো হলে এবং বাজারদর অনুকূলে থাকলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা। তবে আবহাওয়ার বিরূপ আচরণ, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে কৃষকের মনে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল এলাকার কৃষক সাইদুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে বাঁধাকপির আবাদ করেছেন। তিনি জানান, সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি, কীটনাশক ও নিড়ানিসহ সব মিলিয়ে তাঁর উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। এরই মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ হাজার টাকার বাঁধাকপি বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারদর বজায় থাকলে ওই জমির বাঁধাকপি বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
একই উপজেলার কসবা গ্রামের কৃষক মুনছুর ইসলাম এক বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন শিমের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ৩৩ শতকে এক বিঘা হিসাবে তাঁর জমিতে শিম চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে কিছু শিম বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমান বাজারদর বজায় থাকলে সব মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
কৃষকের লাভের এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাজারে ক্রেতাদের প্রত্যাশা কিছুটা ভিন্ন। আগাম শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় নওগাঁর বিভিন্ন বাজারে কয়েক ধরনের সবজির দাম কমেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা।
শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ৮০ টাকা, বেগুন ৭০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, ফুলকপি ৮০ টাকা, পটোল ৪০ টাকা, শিম ১২০ টাকা, মুলা ৪০ টাকা, ঝিঙে ৪০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা ও শসা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়।
শহরের পৌর কাঁচাবাজারে সবজি কিনতে আসা জামিলুর রহমান ও পারভীন আক্তার বলেন, কয়েক দিন আগেও বিভিন্ন সবজির দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। এখন কিছু সবজির দাম কমতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি মিলছে। তবে বর্তমান দামও সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের সামর্থ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমবে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
খুচরা সবজি বিক্রেতা ফিরোজ হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ আগেও বাজারে বিভিন্ন সবজির দাম অনেক বেশি ছিল। তখন কিছু সবজি বর্তমান দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে। এখন সরবরাহ বাড়ায় সবজিভেদে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। বাজারে সবজির সরবরাহ আরও বাড়লে দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
পাইকারি বিক্রেতা মিলন হোসেন বলেন, তাঁরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। তাঁর দাবি, পাইকারি পর্যায়ে কেনাবেচায় খুচরা বাজারের তুলনায় প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কম দামে সবজি সরবরাহ করা হয়। সামনে আরও সবজি বাজারে উঠবে, ফলে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমতে পারে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, আগাম শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তাঁরা ভালো লাভ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় প্রায় ৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষাবাদ হচ্ছে।




