সাভার-আশুলিয়ায় দুই শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি, চলমান সহিংসতাকে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের জেরে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় দুই শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া মোবাইল ফোনে এ তথ্য জানান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কারখানার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে কয়েক দিন ধরে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর শিল্পাঞ্চল ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকেরা অবরোধ-বিক্ষোভ করছেন; এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষও হয়েছে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, শ্রমিকদের ঘিরে দুষ্কৃতকারীরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে; তাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের লোকজনের সংখ্যাই বেশি। হেমায়েতপুরে শুরুতে তারাই পোশাক কারখানায় হামলা চালায়, এতে শ্রমিকেরা আতঙ্কিত হয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। প্রকৃত শ্রমিকেরা আজকের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে তিনি জানান।
শামীমা পারভীন আরও বলেন, হেমায়েতপুর এলাকা থেকে একটি ককটেলসহ একজনকে আটক করা হয়েছে; তিনি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক শিল্পে বর্তমানে যা ঘটছে তা কোনো স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন নয়; সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা। বুধবার সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কোনো অমীমাংসিত দাবি-দাওয়া নেই, অথচ একটি মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এই বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সঙ্গে সাধারণ কোনো শ্রমিক যুক্ত নেই; বরং শ্রমিক আন্দোলনের নামে কিছু বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তি হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে থাকা কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ভূমিকা এর পেছনে কাজ করছে। পাশাপাশি মাফিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিচালিত চক্রান্ত বাস্তবায়নের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এসব রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা কঠোর হস্তে দমনের নির্দেশনা সরকার দিয়েছে বলে তিনি জানান।
শ্রমিকদের মূল দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, প্রতি তিন বছর পর নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করাই ছিল প্রধান দাবি। সরকার যথেষ্ট সময় আগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল; শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম দিতে কিছুটা সময় লাগায় বোর্ড গঠনে সামান্য বিলম্ব হলেও নাম পাওয়ার পরপরই মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে এবং ইতিমধ্যে এর প্রথম সভা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিনিয়র জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের প্রতিনিধি আছেন। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে আগামী ১ জানুয়ারি (২০২৭) থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বোর্ড কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও বিশদ আলোচনা হয়েছে। উভয়পক্ষই একমত হয়ে স্বীকার করেছে, এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলন নয়; নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শ্রমবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব ও শিল্পবান্ধব এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়গুলো বিবেচনার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না। বাহিনীর অনেক সদস্য গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও তারা সংযম দেখিয়েছেন; তবে মাফিয়া ও অপরাধী চক্রকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সাধারণ শ্রমিকদের কোনো উসকানি ও গুজবে কান না দিয়ে অবিলম্বে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা কাজে ফিরলে শিল্প উৎপাদন সচল থাকবে এবং শ্রমিকদের নিজস্ব কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকবে।
সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি আটক হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার কারণেই প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং বিষয়টি আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।



