পোশাকশ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দিলে আইনি ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি, গ্রেপ্তার ৪০
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে; মিরপুরে 'নাশকতা ঠেকাতে' মাঠে নেমেছে যুবদল ও ছাত্রদল। গাজীপুরে শ্রমিকদের ধাওয়ায় পুলিশ সদস্যদের দৌড়ে থানায় ঢোকার ঘটনাও ঘটেছে।
শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগতরা উসকানি দিচ্ছে। এই ঘটনায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে তৈরি পোশাক শিল্পে বিশৃঙ্খলা বা অস্থিতিশীলতা তৈরির যেকোনো অপতৎপরতা অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিহত করার পাশাপাশি আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে চিংড়িমহাল ব্যবস্থাপনাবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করার জন্য কেউ কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে সরকার আইনি ব্যবস্থা নেবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিয়ে কারখানা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উৎপাদন স্থগিত রেখে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কারখানা খুব শিগগিরই খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কিছু দুষ্কৃতকারী হামলার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের যেসব দাবি-দাওয়া ছিল, সেগুলো পূরণ করা হয়েছে; মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং শ্রমিকেরাও সন্তুষ্ট হয়েছেন।
তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের শ্রমিকনেতা এবং কারখানা মালিকদের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছে। গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম ইতোমধ্যে পুরোদমে শুরু হয়েছে এবং সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় দর-কষাকষি অনুষ্ঠিত হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয়, এমন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকারও বোর্ডের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলে তিনি জানান।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিল্পাঞ্চলে নতুন করে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অসন্তোষের যৌক্তিক অবকাশ নেই উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কোনো মহল রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে এই অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার এটা কঠোর হস্তে দমন করবে।
অন্যদিকে পোশাক খাতের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা কেবল আসন্ন ডিসেম্বরকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই এমন ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে যেকোনো মূল্যে এসব অপচেষ্টা সরকার রুখে দেবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা জানান, সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনা করা হলেও শ্রমিকদের বাস্তব সংকটের কথা বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির ইতিবাচক সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
তবে রাজপথে যে সহিংস রূপ দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই সাধারণ মেহনতি শ্রমিকদের আচরণ হতে পারে না দাবি করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী এ ধরনের নৈরাজ্যের নেপথ্যে সীমান্তের ওপার থেকে আসা ইন্ধন রয়েছে। একটি সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে নেমে কোনো কিছু করার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের আর অবশিষ্ট নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন; তবে দলটির কাছে সঞ্চিত থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থের জোরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৌশল প্রসঙ্গে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন, অতীতের মতো বলপ্রয়োগ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় না। রাজপথে থাকা তরুণরাও দেশের নাগরিক উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব সীমিত রেখে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাধানের পথে এগোচ্ছে প্রশাসন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের যে চর্চা ছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে পুলিশকে আইনানুগ ও সংঘাতের মাত্রা অনুযায়ী ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।




