…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
জাতীয়

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে তৃতীয় দিনের বিক্ষোভে উত্তাল শিল্পাঞ্চল, সরকার ও বিরোধী দলকে এক টেবিলে বসার তাগিদ রাজনীতিকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে তৃতীয় দিনের বিক্ষোভে উত্তাল শিল্পাঞ্চল, সরকার ও বিরোধী দলকে এক টেবিলে বসার তাগিদ রাজনীতিকদের
ছবি: সংগৃহীত

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গত তিন দিন ধরে আন্দোলনে রয়েছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকরা। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে তাঁরা পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছেন।

সর্বশেষ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া এবং ঢাকার মিরপুরেও দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকা থেকে মেট্রোরেল চলাচল ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকশ শিল্পকারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে গত ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ১৩৮ ধারার ৩(ক) ও ৩(খ) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং ১৩৯ ধারায় নির্ধারিত কার্যাবলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এই বোর্ড গঠন করা হয়।

তবে বোর্ডের সভা কবে হবে, সে নিয়ে শুরুতে সুনির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। একাধিক পোশাকশ্রমিক জানিয়েছেন, ক্ষুব্ধ মনোভাব থেকেই তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। তাঁদের ধারণা, আগামী ডিসেম্বর থেকেই শ্রমিকদের বেতন বাড়ার কথা; কিন্তু সরকার বিলম্বে বৈঠক করলে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এই আবহে মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণে বোর্ডের প্রথম বৈঠকের নোটিশ জারি করা হবে। বোর্ডের একজন সদস্য বলেছেন, বৃহস্পতিবার প্রথম বৈঠকে বসার আশা করছেন তাঁরা; বৈঠক না হলে কার্যক্রম শুরু করতে আরও দেরি হবে। বোর্ড গঠনের পর তিন দিন পার হলেও বৈঠক না হওয়ায় শ্রমিকনেতাসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

রোববার গঠিত ছয় সদস্যের এই বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। নিরপেক্ষ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। বোর্ড বিভিন্ন পদে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করবে; সেই সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করবে সরকার। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আগে পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণ হতো; গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধনে সেই সময় কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।

অস্থিরতার পেছনে ইন্ধনের প্রশ্নে প্রায় একই অভিযোগ এনেছে সরকার ও বিরোধী দল। গত ১ নভেম্বর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে; সরকার তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। অন্যদিকে ২ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে ষড়যন্ত্রকারী ও ধান্দাবাজদের উসকানি থাকতে পারে; পরিস্থিতি উসকে দিয়ে পোশাকশিল্প ধ্বংসের অপচেষ্টা রুখতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনীতিবিদরা। কেউ কেউ বলছেন, এতে রাজনৈতিক অপশক্তির ইন্ধন আছে; আবার কারও অভিযোগ, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। তাঁদের মতে, সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, অন্যথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলকে এক টেবিলে বসার তাগিদ দিয়েছেন রাজনীতিকদের কেউ কেউ।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার সঙ্গে সরকারের খুব বেশি দূরত্ব নেই। এ জন্যই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আরও কিছু প্রক্রিয়া থাকে। বোর্ডের বৈঠক হতেও তো কমপক্ষে এক-দুই মাস সময় প্রয়োজন। কিন্তু এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছে।’ কারা জড়িত থাকতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে আটক নাশকতাকারীদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্তদের দেখা গেছে; এই পরিস্থিতির নেপথ্যে বিদেশি শক্তির ইন্ধনও থাকতে পারে। এই মুহূর্তে কেউ যেন ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অবৈধ স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব। একই সঙ্গে কেউ যদি শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, সহিংসতা বা শিল্পকারখানার ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করে, তবে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘১৫-১৬ হাজার টাকা দিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার নির্বাহ করা কঠিন। আর ৩০ হাজার টাকা দিয়েও অনেকের পরিপূর্ণ চলে না। তাই সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সরকার ও বিজিএমইএর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। সরকার মূল উদ্যোগ না নিয়ে বিলম্ব করে ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে দেখা; চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ ইস্যু তৈরি করতে পারে। এই মুহূর্তে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি; প্রয়োজনে বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এক টেবিলে বসতে পারে সরকার।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সরকার ও বিজিএমইএ যথাসময়ে ন্যায্য ভূমিকা না নেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের নিয়ম; সে হিসেবে আগামী ডিসেম্বর থেকেই বেতন বাড়ার কথা। সরকারের আরও অনেক আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করা উচিত ছিল। অতীত অভিজ্ঞতায় বোর্ড গঠনের পর মজুরি নির্ধারণে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় লাগে; অথচ অক্টোবর পেরিয়ে নভেম্বর চলে এসেছে — এতে ডিসেম্বর থেকে বেতন বাড়বে কি না, তা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে এবং জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রিন্স আরও বলেন, সরকার যদি বোর্ড গঠনের সময় স্পষ্ট করে বলত যে ডিসেম্বর থেকেই নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হবে এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বরের বেতন বর্ধিত হারে দেওয়া হবে, তাহলে অনেক সংকটের সমাধান হয়ে যেত। তাঁর মতে, শ্রমিকদের অসন্তোষের আরও কারণ রয়েছে — বেতন কম, কর্মপরিবেশ সুষ্ঠু নয়, নারী শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত অনেক শ্রমিককে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়, যাতে তাঁরা অন্য কোথাও চাকরি নিতে না পারেন; এটি বেআইনি। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেপ্তার শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে এবং সরকারকে এখনই ঘোষণা দিতে হবে যে মজুরি বোর্ড দ্রুত বসবে ও নতুন ন্যূনতম মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তাঁর ধারণা, এমন ঘোষণা দিলেই অসন্তোষ অনেকটাই দূর হবে। তিনি বলেন, বেতন বাড়লে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে; রপ্তানি ও আয় কমেনি, সেই আয়ের ন্যায্য হিস্যা যেন শ্রমিকরাও পান, সে বিষয়ে সরকার ও বিজিএমইএকে ভূমিকা নিতে হবে।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সরকার নবম পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে আমরা ধারণা করছিলাম, দেশের অন্যান্য শ্রমজীবী-পেশাজীবীদের বেতন বৃদ্ধির জোরালো দাবি উঠবে। সে প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের দাবি যথেষ্ট যৌক্তিক। তবে এ আন্দোলনকে সহিংস আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে যে ষড়যন্ত্র আছে, তা ইতোমধ্যে পরিষ্কার। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, সেজন্য সাধুবাদ। এখন দ্রুত একটা যৌক্তিক বেতন স্কেল ঘোষণা করলেই আপাতত সমাধান সম্ভব বলে মনে করি।’

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

পোশাকশ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দিলে আইনি ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি, গ্রেপ্তার ৪০

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়ে…

বিকেলে থেমে এলো সাভার-আশুলিয়ার শ্রমিক বিক্ষোভ, সাধারণ ছুটি ২৬৪ কারখানায়
জাতীয়

বিকেলে থেমে এলো সাভার-আশুলিয়ার শ্রমিক বিক্ষোভ, সাধারণ ছুটি ২৬৪ কারখানায়

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং ও শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ সোমবার (২ ন…

জাতীয়

চতুর্থ দিনে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন: সংঘর্ষ-অবরোধে আহত অন্তত ৪৫, ছুটি ৩০৬ কারখানায়

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলন মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। এদিন রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর …

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে হেমায়েতপুরে মহাসড়ক অবরোধ, গাজীপুরে সংঘর্ষে উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল
জাতীয়

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে হেমায়েতপুরে মহাসড়ক অবরোধ, গাজীপুরে সংঘর্ষে উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল

পোশাকশ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ…