স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এনসিপি-জামায়াত টানাপোড়েন, জোট ভাঙনের গুঞ্জন নাকচ দুই পক্ষেরই

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রার্থী দেওয়া এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি জোট ছাড়ার গুঞ্জনকে আরও জোরালো করেছে। তবে দুই দলের নেতারাই আপাতত ঐক্য ভাঙার সম্ভাবনা নাকচ করছেন।
এনসিপির একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে না করার বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান থেকেই দুই দলের টানাপোড়েনের সূত্রপাত। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শরিকদের ছাড় না দিয়ে জামায়াতের এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট এনসিপি। অন্যদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে জামায়াতের পরাজিত প্রার্থীর আচরণ এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে দলটির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে এনসিপি।
গত ৩১ অক্টোবর ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম অংশ নেননি। এর আগে ৩০ অক্টোবর শাহবাগে এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং খুলনায় হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যেও জামায়াতের সাম্প্রতিক অবস্থানের সমালোচনা উঠে আসে। দুই নেতাই ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
এ ছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সরকার সৃষ্টি করেনি বলে সংসদে জামায়াত আমিরের দেওয়া বক্তব্যও ভিন্নভাবে দেখছে এনসিপির একটি অংশ। তাদের ধারণা, দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার কারণে জামায়াতের সঙ্গে দলটির এখনো এক ধরনের বোঝাপড়া থাকতে পারে। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এনসিপির ভেতরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির এক যুগ্ম সদস্যসচিব বলেন, ‘আসলে বিএনপি ও জামায়াত তো অতীতে লম্বা সময়জুড়ে একসঙ্গে ছিল। তাই এখন বিপরীতমুখী রাজনীতি করলেও তাদের মধ্যে পরোক্ষভাবে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকতেই পারে। সেটি একেবারেই অমূলক হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতায় জামায়াত তেমন জোরালো কোনো অবস্থান নিতে পারছে না।
বিএনপি ও জামায়াত নিয়ে সন্দেহের কারণেই নাহিদ ইসলাম ১১ দলের লং মার্চে অংশ নেননি কি না, জানতে চাইলে ১১ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক মাওলানা হাসান জুনাইদ বলেন, ‘বিষয়টি এমন মনে হচ্ছে না। তবে ঢাকার একটি সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জামায়াতের সমর্থন দেওয়া না দেওয়া নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথা শোনা যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েও জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষ থেকে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীকে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে শরিক কোনো দলই ইতিবাচক হিসেবে দেখেনি।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের একলা চলো নীতির কারণেই মূলত দলটির সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুই দলের মূল টানাপোড়েন ও দূরত্ব শুরু হয়েছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দরকষাকষি থেকে।’ ওই নেতা জানান, ঢাকার যেকোনো একটি সিটিসহ কমপক্ষে তিনটি সিটিতে ছাড় পেতে চায় এনসিপি। এ বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দুই দলের মধ্যে ঘরোয়া বৈঠক হয়। সেখানে ঢাকার দুই সিটির মধ্যে অন্তত একটিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকে এনসিপি। তবে জামায়াত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ঢাকার কোনো সিটিতে শরিকদের ছাড় দেওয়া হবে না।
এরই মধ্যে ঢাকা উত্তরে শিবিরের সাবেক সভাপতি সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াত। দুই প্রার্থীই পুরোদমে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে এনসিপিকে ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল জামায়াত, কিন্তু এনসিপি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি।
অন্যদিকে গত ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর কাছ থেকে জামায়াতের পরাজিত প্রার্থীর মিষ্টি খাওয়া ও ফুলের মালা গ্রহণের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি এনসিপি। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে জামায়াতের জোরালো প্রতিবাদ না করার বিষয়টিও দলটির সমালোচনার কারণ হয়েছে। এ নিয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) শাহবাগে দলের গণবিক্ষোভে তীব্র প্রতিবাদ জানান এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ নিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান।
১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের গুঞ্জনকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। গত ১ নভেম্বর রাজধানীতে জাতীয় যুবশক্তির একটি অনুষ্ঠানে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘অনেকে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন যে, ১১ দলীয় জোটে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এ ধরনের কোনো আশঙ্কা আমাদের নেই। সর্বশেষ লং মার্চে আমাদের দলীয় প্রধান অংশগ্রহণ না করায় বিষয়টি সামনে এসেছে। এর আগেও জোটের অন্য নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি। কেউ অসুস্থ থাকতে পারেন, কারও অন্য কাজ থাকতে পারে। প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, এমন কোনো নিয়ম নেই। তাই এ ধরনের গুজবের কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে করি না।’
একই কথা জানান এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহাবুব আলম। তিনি বলেন, ‘কিছু বিষয়ে মনোমালিন্য থাকলেও ১১ দল থেকে এনসিপি এখনই আলাদা হয়ে যাবে বলে যে ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়।’ তিনি জানান, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১১ দলের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের ব্যর্থতার কারণে এই ঐক্যের প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়ছে।
এনসিপির ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ার খবরকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন প্রধান শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক জোট বা ঐক্যের প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন দলের ভিন্ন মত থাকতে পারে। তাদের আলাদা আলাদা কৌশল থাকতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের রাজনীতিতেও এমনটি দেখা যায়। কিন্তু মতবিরোধ থেকেই ঐক্য ভাঙতে পারে না।’ তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে করতে এনসিপি বেশি আগ্রহী এবং এ ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় ছাড় পেতে চায় দলটি। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দলই আলাদাভাবে অংশ নিতে পারে।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘কারণ আমাদের সঙ্গে আরও দল আছে। সেখানে এনসিপিকে আসন দিলে তো অন্যরাও চাইবে। তাই আমরা নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছি। বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন জোট করলেও তারাও তো আমাদের সিটিতে ছাড় দেয়নি। সেটিও এনসিপিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারাও ইতোমধ্যে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাই আমাদের ঐক্যে ফাটল হওয়ার শঙ্কা আপাতত নেই।’




