পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিতে ফলানো খেজুর ‘ইসরায়েলের পণ্য’ লেবেলে অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রির প্রমাণ মিলল বিশ্লেষণে

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোতে ফলানো লাখ লাখ ডলারের খাদ্যপণ্য ‘ইসরায়েলের পণ্য’ লেবেল লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে বাণিজ্য তথ্যের নতুন এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। মানবাধিকার আইনি সংগঠন গ্লোবাল ইকো এই বিশ্লেষণ করেছে ইসরায়েল সরকার ও অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাণিজ্যিক নথি ও সরকারি বাণিজ্য তথ্যের ভিত্তিতে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত আট বছরে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলো থেকে অন্তত ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের (৭২ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার) জৈব খেজুর অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে। ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া ১৩২টি কৃষিপণ্যের চালান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর ৮৫টি চালানেই—অর্থাৎ ৬৪ শতাংশে—বসতিতে উৎপাদিত পণ্য ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অনুপাত আরও বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া খেজুরের ২৪টি চালানের মধ্যে ২০টিই এসেছে বসতি এলাকা থেকে বলে গ্লোবাল ইকোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো খেজুর যেসব বসতিতে ফলানো হয়, সেগুলোর মধ্যে নেতিভ হাগদুদ, বেইত হারাভা, আরভোত জেরিকো, হামরা, তোমের, মেচোরা ও নারানের নাম এসেছে বিশ্লেষণে। এই বসতিগুলো পশ্চিম তীরের অধিকৃত অংশে অবস্থিত, যাকে অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, বসতির পণ্য রপ্তানির সময় উৎস হিসেবে ইসরায়েলের নাম লিখতে হয়, যদি না গন্তব্য দেশের আইনে এমন লেবেল নিষিদ্ধ থাকে। অস্ট্রেলিয়ায় বসতি এলাকার পণ্য আমদানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, সেগুলো অধিকৃত ভূমি থেকে এসেছে বলে লেবেলে উল্লেখ করারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
গ্লোবাল ইকোর নির্বাহী পরিচালক এমিলি শেফার ওমের-মান বলেছেন, বসতির পণ্য অস্ট্রেলিয়ার বাজারে আছে এবং বিশ্লেষণ করা চালানগুলোতে ‘ইসরায়েলি’ লেবেলের কৃষিপণ্যের বেশির ভাগই বসতি থেকে এসেছে—এটি অস্ট্রেলিয়ার ভোক্তাদের জন্য ‘চমকে দেওয়ার মতো’ বিষয় হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘এর মানে হলো, ইসরায়েলি খেজুর ও অন্যান্য ইসরায়েলি কৃষিপণ্যের অস্ট্রেলীয় ভোক্তারা খুব সম্ভবত ফিলিস্তিনি ভূমির চলমান দখল ও বসতি স্থাপনে অবদান রাখছেন।’
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং সেপ্টেম্বরে সিনেটে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি অবৈধ এবং অস্ট্রেলিয়া সরকার ইসরায়েলকে আহ্বান জানিয়েছে যেন বসতি স্থাপনকারীরা সম্পত্তি ধ্বংস, পরিবার উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বন্ধ করে। তবে তিনি বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া বসতির পণ্যের ওপর সর্বাত্মক আমদানি নিষেধাজ্ঞার পথ খুঁজছে না; এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও অস্ট্রেলীয় ব্যবসায় এর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ আছে বলে তিনি জানান। যুক্তরাজ্য, স্পেন, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস বসতির পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে বা কার্যকর করেছে।
গত জুনে গ্লোবাল ইকো ‘ইমপোর্টিং অকুপেশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে ইউরোপে ইসরায়েলি রপ্তানিকারকদের অধিকৃত ফিলিস্তিনে উৎপাদিত পণ্যের উৎস গোপন করে কর ছাড় নেওয়া ও বসতি অর্থনীতি চাঙা করার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। শেফার ওমের-মান বলেছেন, পণ্যের উৎস ভুলভাবে দেখানো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দুর্ঘটনা নয়; তাঁর ভাষায়, বসতি স্থাপনের শুরু থেকেই কৃষিকে বড় আকারে ভূমি দখল ও ধীরে ধীরে সংযুক্তির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক সারা সানবার বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অবৈধ বসতিগুলোর ‘জীবনরেখাগুলোর একটি’। তাঁর ভাষায়, এসব বসতি শুধু আবাসিক জনবসতি নয়—এগুলো অবৈধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিনি বলেন, কোনো ফিলিস্তিনি কৃষক বসতি সম্প্রসারণের কারণে নিজের জমিতে ঢুকতে না পেরে জীবিকা হারাতে পারেন, অথচ সেই একই জমিতে বসতিভিত্তিক কৃষি ব্যবসা লাভ করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, অবৈধ বসতি ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। ক্যানবেরায় ইসরায়েলি দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছিলেন, ‘বসতি সন্ত্রাসীরা’ পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিলেল নিউম্যান তখন দ্য অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকাকে বলেছিলেন, বসতি ইস্যুটি ‘মাত্রাতিরিক্ত বড় করে’ দেখানো হয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়ার যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করা উচিত নয়।



