প্রতিরক্ষা ও এআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ খনিজে চীনের ওপর 'বিপজ্জনকভাবে' নির্ভরশীল যুক্তরাজ্য: সংসদীয় তদন্ত

সামরিক খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য চীনের ওপর 'বিপজ্জনকভাবে' নির্ভরশীল বলে এক সংসদীয় তদন্তে উঠে এসেছে।
ব্যবসা নির্বাচন কমিটির এমপিরা জরুরি ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীভূত নীতি ও একটি 'ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি' গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই তহবিল বিরল মৃত্তিকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের খনিতে অর্থায়নে সহায়তা করবে এবং অনুদান, ইকুইটি ও ঋণ ব্যবহার করে সরবরাহ বৈচিত্র্যের কর্মসূচি ত্বরান্বিত করবে।
কমিটির চেয়ার লিয়াম বায়ার্ন বলেন, 'গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নতুন অর্থনীতির আলফা।' তাঁর ভাষ্য, যেসব প্রযুক্তি এসব খনিজের ওপর নির্ভর করে, সেগুলো সুরক্ষিত না হলে ব্রিটেনকে পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত করা, এআই গড়া কিংবা নিট জিরো অর্জন কোনোটাই সম্ভব নয়। অথচ চীন প্রথমবার বিরল মৃত্তিকার ওপর তার নিয়ন্ত্রণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ১৬ বছর পরও ব্রিটেন বিপজ্জনকভাবে উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বায়ার্নের কমিটি চীন বিষয়ে সরকারের নীতির সমালোচনা করল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ এবং সেগুলোর পরিশোধিত উপজাতের ওপর চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব উপাদান সামরিক জেট থেকে শুরু করে গাড়ির লকিং ব্যবস্থা ও ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিনের মতো ভোক্তাপণ্যেও ব্যবহৃত হয়।
কমিটির শুনানিতে বলা হয়েছে, আসল প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে 'প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে', যেখানে সাতটি শ্রেণির খনিজের পরিশোধনে চীনের আধিপত্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশোধিত লিথিয়াম এবং তাপমাত্রার চরম অবস্থা সহ্য করতে সামরিক বিমানের ফিউজলেজ ও ডানায় ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা।
এমপিদের জানানো হয়েছে, এখন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু লিথিয়ামের চাহিদাই ৪৫ গুণ বাড়বে, যা যুক্তরাজ্যকে উচ্চঝুঁকির নির্ভরতার সম্পর্কে ফেলে দেবে। একই সময়ে সামরিক জেটসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত স্থায়ী চুম্বকের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল মৃত্তিকার চাহিদা বাড়বে ১৬ গুণ, যখন ব্রিটেন তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
কমিটির মতে, ২০২৫ সালের মতো চীন হঠাৎ করে বিরল মৃত্তিকার সরবরাহ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হওয়ায় বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা।
এর বাইরে চীনা মালিকানাধীন নেক্সপেরিয়া নিয়ে নেদারল্যান্ডসের হস্তক্ষেপ ঘিরে বিরোধের পর লিগ্যাসি চিপে আলাদা নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও ঘটেছে, যার কারণে গত অক্টোবরে ইউরোপীয় গাড়িশিল্প বন্ধ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন দূরে চলে গিয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশও চীনের পক্ষ থেকে বিরল মৃত্তিকার সরবরাহ বন্ধের একই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কমিটির মতে, বিকল্প সরবরাহ খুঁজতে যুক্তরাজ্য যথেষ্ট চেষ্টা করছে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত অক্টোবরে শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে বিরল মৃত্তিকার ওপর বৈশ্বিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় এক বছরের ছাড় পেয়েছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের পর সেই ছাড় ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই ছাড়ের ফলে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
কমিটির মতে, সবচেয়ে 'বাস্তবসম্মত' সমাধান হলো জি৭ অংশীদার, ইউরোপের বাকি অংশ ও ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে 'চাহিদা একত্র' করা এবং নতুন সরবরাহকারী আনা।
সরকারের স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে কমিটি। তাদের ভাষ্য, সরকার কোন সক্ষমতা রক্ষা করতে চাইছে, কোন দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে কিংবা ঝুঁকি কমাতে কোন প্রকল্পে সমর্থন দিচ্ছে, সে বিষয়ে পার্লামেন্টের কোনো ধারণা নেই।
কমিটি একটি ১০ দফা পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় খনি খনন, পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের সুযোগ ও তার খরচ চিহ্নিত করা, চীন থেকে ক্রয় কমাতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার কৌশল, বিনিয়োগ আনলক করার পরিকল্পনা এবং খনির ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে এমন পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া মূল্যায়ন। কমিটির বক্তব্য, বর্তমান অবস্থায় তাদের ১০টি পরীক্ষার কোনোটিতেই সরকার পাস করতে পারবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী হতে পারছে না। কমিটির সিদ্ধান্ত, যুক্তরাজ্যের 'নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক শক্তি' প্রয়োজন।
তবে সরকারের একজন মুখপাত্র এই দাবি অস্বীকার করেছেন যে সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কৌশল নেই। তিনি বলেন, সরকার দেশীয় উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহার বাড়াতে এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়তে ৪০ কোটি পাউন্ড দিচ্ছে। মুখপাত্র আরও বলেন, সরকারের কৌশলে ২০৩৫ সালের জন্য স্পষ্ট লক্ষ্যও রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় উৎপাদন থেকে চাহিদার ১০ শতাংশ ও পুনর্ব্যবহার থেকে ২০ শতাংশ মেটানো এবং কোনো একক দেশ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ৬০ শতাংশের বেশি না আনা।




