বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে সহজ লেনদেন ব্যবস্থা চান দুই দেশের ব্যবসায়ীরা, এফবিসিসিআইয়ে সমঝোতা স্মারক সই

বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দুই দেশের মধ্যে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা সহজ করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ-রাশিয়া বিজনেস ডায়ালগ’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা উঠে আসে।
এফবিসিসিআই ও রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। সংলাপে রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন ইলিয়া শেস্তাকভ।
স্বাগত বক্তব্যে মো. ফজলুল হক বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর ভালো সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বড় কোনো বাধা নেই বললেই চলে। তবে যেসব ছোটখাটো বাধা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে যৌথভাবে দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের প্রধান ইলিয়া শেস্তাকভ বলেন, বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, বাণিজ্যের পরিমাণের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অংশীদার। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য, খাদ্য ও সার সরবরাহ বাড়াতে চায় রাশিয়া। পাশাপাশি জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও ই-গভর্ন্যান্স খাতে যৌথভাবে কাজ করতেও দেশটি আগ্রহী বলে তিনি জানান।
ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বলেন, বিধিবিধান সহজ করা এবং লজিস্টিকস ও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা জরুরি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআই ও রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এফবিসিসিআই জানায়, দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করাই এই সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য। এর আওতায় দুই দেশের কোম্পানিগুলোর যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য মেলা, প্রদর্শনী, বিজনেস মিশন ও বিনিয়োগ ফোরাম আয়োজনে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আসে। রাশিয়ার প্রধান কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকেও বাদ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।
এই লেনদেন জটিলতার প্রভাব পড়েছে রপ্তানিতে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এরপর থেকে তা কমতে থাকে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি নেমে এসেছে ২৫ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে। অর্থাৎ চার বছরে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, তৃতীয় কোনো দেশের মুদ্রায় অর্থ গ্রহণ করলে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা বা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে অনেক ক্রেতা হারাতে হচ্ছে তাদের।
লেনদেনের এই জটিলতা কাটাতে গত জুলাইয়ে নতুন প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। এতে দুই দেশের বাণিজ্যের দেনা-পাওনা ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়। পাশাপাশি দুই দেশের জন্য আলাদা পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি এবং ঢাকায় রাশিয়ার একটি ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাবও পুনরায় তোলে দেশটি। রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধও এই লেনদেন জটিলতায় আটকে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মিয়া সাত্তার, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আয়নুর আক্তার পান্না, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান।




