বিদেশে প্রসাধনী অস্ত্রোপচারের ‘ছুটির প্যাকেজ’ নিয়ে সতর্ক করলেন ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা

বিদেশে গিয়ে প্রসাধনী অস্ত্রোপচার করানোর প্যাকেজগুলোকে অনেক সময় রোদ, সমুদ্র আর অস্ত্রোপচারের আকর্ষণীয় ছুটি হিসেবে তুলে ধরা হলেও এসব ভ্রমণ সংক্রমণ, বিকৃতি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা।
পরামর্শক প্লাস্টিক সার্জন এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনসের সাবেক সভাপতি নোরা নুজেন্ট বলেছেন, তুরস্কের মতো দেশে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি শুধু অপারেশন টেবিলেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ভাষায়, ঝুঁকি শুরু হয় বিমানে ওঠার মুহূর্ত থেকে এবং পুরোপুরি সেরে ওঠা ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকির সময় পেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তা থাকে।
নুজেন্ট জানান, ভ্রমণ নিজেই রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে অস্ত্রোপচারের পর সামনাসামনি পরিচর্যা বা আফটারকেয়ার না পাওয়াও উদ্বেগের বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রিটিশ কলেজ অব অ্যাস্থেটিক মেডিসিন ‘ভেট ইট বিফোর ইউ গেট ইট’ নামের প্রচারণার অংশ হিসেবে একটি যাচাই তালিকা প্রকাশ করেছে। সম্ভাব্য রোগীরা যাতে বিদেশে প্রসাধনী অস্ত্রোপচার নিয়ে আরও ভালো ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
প্রচারণাটিতে সতর্ক সংকেতগুলো চেনার পাশাপাশি সার্জনের যোগ্যতা নিজে যাচাই করা, নির্বাচিত ক্লিনিকের কাছাকাছি জরুরি চিকিৎসা সুবিধা কী আছে তা জানা এবং চিকিৎসকের কী ধরনের বিমা সুরক্ষা আছে তা খুঁজে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নুজেন্টের মতে, রোগীদের তুরস্কের মতো দেশে যাওয়ার বড় কারণ সেখানকার তুলনামূলক কম খরচ। তবে যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার বেশি ব্যয় এবং চিকিৎসা ক্ষতিপূরণ ও বিমার বেশি ফি-সহ নানা কারণে সেখানে দাম বেশি বলেও তিনি জানান।
বিশেষায়িত চিকিৎসা অবহেলা আইন প্রতিষ্ঠান লুপা ল-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ক্রিসি উলফ বলেছেন, বিদেশে কোনো অস্ত্রোপচার ভুল হলে দাবি আদায়ে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলেও তা যুক্তরাজ্যের তুলনায় অনেক কম হতে পারে।
উলফ বলেন, প্রসাধনী অস্ত্রোপচারের জন্য তুরস্ক সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হলেও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেটিই সবচেয়ে কঠিন। তাঁর ভাষায়, সেখানে কিছু ভুল হলে তা ঠিক করা অবিশ্বাস্যরকম কঠিন হয়ে পড়ে।
একাধিক অস্ত্রোপচারের বান্ডল প্যাকেজ বা সময়সীমাবদ্ধ অফার বিক্রি করা ক্লিনিক সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন উলফ। তিনি এক রোগীর উদাহরণ দেন, যিনি তুরস্কে পেটের অস্ত্রোপচারের জন্য গিয়ে স্তন উত্তোলনসহ ‘মামি মেকওভার’ কিনতে উদ্বুদ্ধ হন এবং ফিরে এসে গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে বাম স্তনের বেশির ভাগ ও পুরো ডান স্তন হারান।
বিদেশে প্রসাধনী অস্ত্রোপচারকে চকচকে ছুটি হিসেবে বাজারজাত করাকে সমস্যাজনক বলেছেন উলফ। তাঁর মতে, এতে রোগীর মনোযোগ আসলে তিনি যে গুরুতর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তার গুরুত্ব থেকে সরে যায়।
এর আগেও বিদেশে প্রসাধনী অস্ত্রোপচার নিয়ে সতর্কতা এসেছিল। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ২০২৪ সালে এ ধরনের অস্ত্রোপচারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেট ব্রিটেনের প্রায় ৫ লাখ ২৪ হাজার বাসিন্দা ২০২৪ সালে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে প্রসাধনী অস্ত্রোপচারও ছিল। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ব্রাজিলিয়ান বাট লিফটে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও বিদেশে করা অন্যান্য অস্ত্রোপচারেও রোগীদের সমস্যায় পড়ার উদাহরণ আছে। নুজেন্ট ফেসলিফটের পর ঘাড়ে ফোড়া ও সংক্রমণে আক্রান্ত এক নারীর কথা বলেন, যাঁর দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক ও নিষ্কাশন প্রক্রিয়া লেগেছে এবং উল্লেখযোগ্য দাগ থেকে গেছে।
নুজেন্ট আরও দুটি উদাহরণ দেন: বিশের শেষ দিকে থাকা এক নারী গর্ভধারণের পর বিদেশে স্তন উত্তোলন ও ল্যাবিয়াপ্লাস্টি করিয়ে এক স্তনের টিস্যু হারান ও ইমপ্ল্যান্ট বেরিয়ে আসে, পরে তাঁর সংশোধনমূলক অস্ত্রোপচার লাগে; আরেক নারীর বিদেশে করা পেটের অস্ত্রোপচারের ক্ষত খুলে গিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হয় এবং পেটে দাগ ও গর্ত থেকে যায়।



