ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিতে ছাড়ের নিশ্চয়তা চায় ইইউ, চাপে যুক্তরাজ্য

ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফিতে ছাড়ের নিশ্চয়তা দিতে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। চলতি মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনের আগেই এই প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চায় জোটটি।
বুধবার জ্যেষ্ঠ ইইউ কূটনীতিকদের এক বৈঠকে অন্তত ছয়টি সদস্য রাষ্ট্র টিউশন ফি নিয়ে চুক্তি সম্মেলনের পর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অনেকের মতে, এই বিষয়ে চুক্তি না হলে ব্রেক্সিটের লাল ফিতার জট কমাতে আসা বহুল প্রতীক্ষিত খাদ্য ও পানীয় চুক্তি কার্যকর হওয়াও পিছিয়ে দেওয়া উচিত।
আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে ইইউ নেতা উরসুলা ফন ডার লেয়েন ও আন্তোনিও কস্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন অ্যান্ডি বার্নহাম। ওই বৈঠকে খাদ্য ও পানীয়, কার্বন বাজার এবং যুব বিনিময়—এই তিনটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ইস্পাত ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ‘বিশ্বস্ত অংশীদারত্ব’ নিয়েও অঙ্গীকার আসতে পারে।
তবে ব্রেক্সিটের পর থেকে ইইউ শিক্ষার্থীদের ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের হারে ফি দিতে হচ্ছে—এই বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। ইইউ চায় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে, যেখানে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমান দেশীয় হারে ফি দিতেন। স্নাতক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফি দেশীয় হারের তুলনায় প্রায় চার থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের আলোচকেরা নভেম্বরের বৈঠকের সফলতা নিশ্চিত করতে টিউশন ফি নিয়ে চুক্তি ছয় মাস পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোসহ অন্তত ছয়টি সদস্য দেশ চায় সম্মেলনের আগেই ফির বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক। চারজন ইইউ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অনেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে এই বিষয়ে আরও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি চাইছেন।
একজন ইইউ কূটনীতিক বলেন, ‘টিউশন ফি নিয়ে চুক্তি ছাড়া যুব অভিজ্ঞতা প্রকল্পের তেমন কোনো বাড়তি মূল্য নেই।’ তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ইইউ দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার খরচ অনেক কম, ফলে এই প্রকল্পে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদেরই তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরেকজন ইইউ কূটনীতিক বলেন, নভেম্বরের সম্মেলন নিয়ে সতর্ক আশাবাদ থাকলেও ‘বড় একটি অংশ’ টিউশন ফির বিষয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি’ চায়। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
ইইউর জন্য ‘ইয়েস’ নামে পরিচিত যুব অভিজ্ঞতা প্রকল্পটি বিশেষ অগ্রাধিকারের। এই প্রকল্পে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা চ্যানেলের দুই পাড়েই বসবাস, কাজ ও পড়াশোনা করতে পারবেন। মানুষে মানুষে যোগাযোগ কমে যাওয়াকে ব্রেক্সিটের বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়, আর অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা নিজেরা যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করেছেন বলে বিষয়টি তাদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ইইউ কর্মকর্তাদের যুক্তি, এই আলোচনায় জোটের হাতে চাপের জায়গা রয়েছে। লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি খাদ্য ও পানীয় চুক্তিটি ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য বছরে আনুমানিক ৫১০ কোটি পাউন্ড মূল্যের বলে ধরা হয়, আর টিউশন ফি নিয়ে সন্তোষজনক চুক্তি হলেই কেবল সেটি কার্যকর হবে বলে ইইউ জানিয়েছে।
একইভাবে ব্রেক্সিটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নির্গমন বাণিজ্য ব্যবস্থা (এমিশন ট্রেডিং) পুনরায় যুক্ত করার চুক্তিও টিউশন ফি চুক্তির অপেক্ষায় পিছিয়ে যেতে পারে। এই চুক্তি কার্যকর হলে ব্রিটিশ রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় কার্বন কর থেকে সুরক্ষা পেতেন।
ফাঁস হওয়া সম্মেলন বিবৃতির একটি খসড়ায় তিনটি চুক্তির এই পারস্পরিক সম্পর্কের ইঙ্গিতও রয়েছে—সেখানে চুক্তিগুলোর ‘যৌথ ও সময়মতো কার্যকর হওয়ার’ প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে।
ইইউ সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, টিউশন ফি নিয়ে চুক্তি না হলে আগামী বছর জোরদার হওয়ার কথা থাকা ইউরোপীয় বিদ্যুৎ বাজারে ব্রিটেনের পুনঃএকীকরণের আলোচনাও পিছিয়ে দিতে পারে জোটটি। ওই বাজারে ফিরতে হলে যুক্তরাজ্যকে দরিদ্র অঞ্চলের উন্নয়নে গঠিত ইউরোপীয় সংহতি তহবিলে ‘যথাযথ’ অনুদানের অঙ্গীকার করতে হবে।
এ সপ্তাহে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে প্রবেশের সুযোগ পেলে ইইউ শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিতে ছাড় দিতে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত যুক্তরাজ্য। তবে ইইউ জানিয়েছে, নভেম্বরের সম্মেলনে ‘মেড ইন ইউরোপ’ নিয়ে কোনো চুক্তি হচ্ছে না, কারণ জোটটি এখনো এ বিষয়ে মূল আইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট নিয়ে নিজেদের অবস্থান চূড়ান্ত করছে।
এই আইনটি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো কৌশলগত শিল্প খাতকে লক্ষ্য করে তৈরি, যাতে সরকারি ভর্তুকি ও চুক্তি কেবল ইউরোপে তৈরি পণ্যের জন্যই বরাদ্দ থাকে।




