…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
জাতীয়

সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের পর শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পোশাকমালিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের পর শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পোশাকমালিকরা
ছবি: সংগৃহীত

সাভার-আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলোতে সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং সময়মতো রফতানি সচল রাখাই এখন শিল্পমালিকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কয়েক দিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানোর চাপ রয়েছে, এর সঙ্গে রয়েছে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার উদ্বেগ।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক দিনের উৎপাদন বিঘ্নের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনিতেই বৈশ্বিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে আসা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে এই খাত।

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ৩১ অক্টোবর থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি ও ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, যা ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলে। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।

শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ৩১ অক্টোবর অন্তত ২৫টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২ নভেম্বর শিল্প পুলিশের হিসাবে প্রায় ৪০টি কারখানা বন্ধ ছিল। পরদিন ৩ নভেম্বর শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৪ নভেম্বর এ সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়ায়। ৫ নভেম্বর অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও এদিন অন্তত ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ছিল।

সংঘর্ষে পুলিশের অন্তত ৫০ সদস্য আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম। আহতদের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ ও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম রয়েছেন। শ্রমিকেরাও আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪ নভেম্বর হেমায়েতপুরে সংবাদ সংগ্রহের সময় পাঁচ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন।

কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় কয়েক দিনে আশুলিয়া থানা ও সাভার মডেল থানায় মোট আটটি মামলা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তফিজুর রহমান। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। প্রথমে ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায় পুলিশ। পরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এক দিনে ৪০ জনকে গ্রেফতারের কথা জানান ডিআইজি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও আটকের তথ্য পাওয়া যায়।

৫ নভেম্বর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শ্রমিকদের দাবির সমাধানের পাশাপাশি কারখানায় নিরাপদ ও স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু মনে করেন, কয়েক দিন কারখানা বন্ধ থাকার প্রভাব পড়বে রফতানি পণ্য পাঠানোর সময়সূচিতে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের বড়দিন সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ রফতানি কার্যক্রম শেষ করার চাপ থাকে।

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে পোশাক কারখানাগুলো প্রায় কয়েক দিন বন্ধ থাকায় শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পড়েছেন মালিকেরা। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরের বড়দিনকে কেন্দ্র করে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ রফতানি কার্যক্রম শেষ করার কথা থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় সময়মতো পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’

মিন্টু কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের দাবি ও মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা দেওয়া সম্ভব হতো এবং শ্রমিকেরা আইন অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারতেন। অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকায় পরিস্থিতি সহিংস পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি মনে করেন; এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও সরকারের প্রশাসনেরও ব্যর্থতা রয়েছে বলে তিনি বলেন।

মিন্টু আরও বলেন, কিছু কারখানা আগে থেকেই বন্ধ ছিল এবং আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হওয়ায় শিল্পের সংকট আরও বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, নির্ধারিত সময়ে পণ্য রফতানি করতে না পারলে মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে কাজ করছেন; নতুন করে কারখানা বন্ধ হলে আরও অনেক শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি বলেন।

মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন মিন্টু। তিনি বলেন, ‘মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের দাবি ও অসন্তোষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের আপাতত কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন সচল রাখা প্রয়োজন। তবে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে কাজে ফেরা কঠিন হবে। তাই শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশি তল্লাশি বা হয়রানির অভিযোগের মতো পরিস্থিতি বন্ধ করে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’

শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে শ্রম আইন বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন। তাঁর অভিযোগ, মালিকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাবের কারণে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনাকে শ্রমিকদের কর্মকাণ্ড বলে মানতে নারাজ তিনি।

রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন মিলে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোয় একজন পিয়নের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর ভাষায়, মে মাসে মজুরি বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও বিষয়টি সরকার ও বিজিএমইএকে দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসা হয়েছে।

সাভারের ওডিসি ক্রাফট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক খান শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে বেতন বৃদ্ধির সুফল শ্রমিকেরা পুরোপুরি পাবেন না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

আবু বকর সিদ্দিক খান বলেন, একজন নতুন শ্রমিকের মূল বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা হলেও বাধ্যতামূলক দুই ঘণ্টা ওভারটাইমসহ মাস শেষে তিনি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পান, এর সঙ্গে হাজিরা বোনাসও যুক্ত হয়। তবে একজন নতুন শ্রমিককে দক্ষ করে তুলতে প্রথম তিন মাস প্রশিক্ষণ দিতে হয়। তিনি আরও বলেন, ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার চাপ থাকে; এর মধ্যে আট দিন কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও শিপমেন্টের সময়সূচিতে বড় চাপ তৈরি হয়, এতে ক্রেতার আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে।

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

আশুলিয়ার জিরাবোতে বেতনে সংসার চলছে না পোশাকশ্রমিকদের: ‘দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি’
জাতীয়

আশুলিয়ার জিরাবোতে বেতনে সংসার চলছে না পোশাকশ্রমিকদের: ‘দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি’

ঢাকার আশুলিয়ার জিরাবো বাজারের পাশের ছোট একটি কলোনিতে দুই পাশে ২০টির মতো ছোট ছোট ঘর রয়েছে, যার সবগুলোতেই থাকেন ওই এলাকায় কর্মরত পোশাকশ্রমিকরা। কারখা…

মজুরি বোর্ড গঠনের পর সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের
জাতীয়

মজুরি বোর্ড গঠনের পর সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতির মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান …

জাতীয়

পিএসসি ভবনের ছাদে বসছে ১২০ দশমিক ৯৬ কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ, ডেসকোর সঙ্গে সমঝোতা সই

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ভবনের ছাদে ১২০ দশমিক ৯৬ কিলোওয়াট-পিক (কেডব্লিউপি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এ জন্য ঢাকা ইলেকট…

গাজীপুর সাফারি পার্কে নীলগাইয়ের পালে চার শাবকের জন্ম, সংখ্যা বেড়ে ১৩
জাতীয়

গাজীপুর সাফারি পার্কে নীলগাইয়ের পালে চার শাবকের জন্ম, সংখ্যা বেড়ে ১৩

গাজীপুর সাফারি পার্কের নীলগাইয়ের পালে নতুন চারটি শাবকের জন্ম হয়েছে। প্রায় দেড় মাস আগে পার্কের কোর সাফারির হরিণ সাফারি এলাকায় শাবকগুলোর দেখা মেলে।…