পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে অভিশংসন শুরু: ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আরও চাপে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট পেনা

ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংকের পতনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের জেরে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি দেশটির কংগ্রেস। বরং তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করেছে আইনসভা।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার নিম্নকক্ষের সদস্যরা ৭৮-০ ভোটে অভিশংসনের পক্ষে রায় দেন। একই সঙ্গে সিনেটও অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করে শুক্রবার প্রেসিডেন্টকে হাজির হওয়ার জন্য তলব করেছে।
২০২৩ সাল থেকে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন রক্ষণশীল রাজনীতিক পেনা। উয়েনো ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক নিজেদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে না পারার পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার তিনি পদত্যাগের উদ্যোগ নেন। এক রেকর্ড করা ভাষণে পেনা বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনার জন্য আহ্বান করা কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে কোরোরাডো পার্টির আইনপ্রণেতারা ওয়াকআউট করায় কোরাম সংকট দেখা দেয়। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পক্ষে পর্যাপ্ত ভোট না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা অধিবেশন ত্যাগ করেন।
কোরোরাডো পার্টির নেতা ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেনার অভিশংসনের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, সরকারি, বেসরকারি ও পেনশন তহবিলের অর্থ চুরির পক্ষে তাঁদের দল অবস্থান নেবে না। জনগণ এবং কোরোরাডো পার্টির মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পেনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করায় তাঁর আইনি ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্যারাগুয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা ছেড়ে দিলে তিনি আজীবনের জন্য সিনেটর হন এবং আইনসভার সদস্য হিসেবে নির্দিষ্ট মাত্রার আইনি দায়মুক্তি ভোগ করেন। তবে অভিশংসন বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে সাবেক প্রেসিডেন্ট এই মর্যাদা পান না।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উয়েনো ব্যাংক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম সলভেন্সি অনুপাত বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকটির হিসাব সংশোধনের পর দেখা যায়, সম্ভাব্য লোকসান সামাল দিতে ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক, উয়েনোর মূলধন তার অর্ধেকেরও কম।
পতনের আগে উয়েনো ব্যাংক দাবি করেছিল, ৬৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে তাদের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। ব্যাংকটির কার্যক্রম ভেঙে পড়ার পর বহু গ্রাহক নিজেদের হিসাবের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছেন। ব্যাংকটির মাধ্যমে বিতরণ করা পেনশনের অর্থও তুলতে পারছেন না অনেকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উয়েনোর অবশিষ্ট তহবিল অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ব্যাংকটির কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্লোস কারভালো পদত্যাগ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট পেনার বিরুদ্ধেও ব্যাংকটির সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে। একসময় উয়েনো ব্যাংকের মূল প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ভাসকেসে তাঁর শেয়ার ছিল। তবে পেনার দাবি, ২০২৫ সালে তিনি ওই শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও আইনপ্রণেতারা তাঁর স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকটির আর্থিক দুরবস্থার তথ্য ধামাচাপা দিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আল জাজিরার লাতিন আমেরিকা সম্পাদক লুসিয়া নিউম্যান বলেন, পেনার বিরুদ্ধে অন্তত অবহেলা এবং ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে পড়ার তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কংগ্রেসের বাইরে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করার দাবিতে অবস্থান করছেন। তাঁদের দাবি, পেনার বিচার ও অভিশংসন নিশ্চিত করতে হবে।
পতনের আগে উয়েনো ব্যাংক একটি ছোট পরিসরের প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে মাঝারি পর্যায়ের ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি তহবিল পরিচালনা করত। ব্যাংকটির পতনের ঘটনা তদন্তে প্যারাগুয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল তিনটি ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব তদন্তে ব্যাংকটির তদারকি এবং প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি তহবিল জমা রাখার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। প্রেসিডেন্ট পেনা জানিয়েছেন, তদন্তকারীদের সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করবেন।
বৃহস্পতিবারের রেকর্ড করা ভাষণে পেনা বলেন, তাঁর প্রধান প্রত্যাশা হলো ব্যাংকে থাকা তহবিলের অর্থ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করা, আমানত সুরক্ষা তহবিলের যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থসহ প্যারাগুয়ের সব নাগরিকের সম্পদ সুরক্ষিত রাখা। পেনাকে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারণ করা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। তবে ব্যাংকটির পতন ও চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে উয়েনো ব্যাংক এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো বিবৃতি দেয়নি।



