পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি স্কুলের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর: ১৮০ শিক্ষকের প্রবেশ অনুমতি বাতিলের মুখে
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোর ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হচ্ছে। শিক্ষকদের প্রবেশ অনুমতির ওপর বিধিনিষেধ এবং ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম গ্রহণের চাপ শহরটিতে ফিলিস্তিনি শিক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
৬৬ বছর বয়সী রসায়নের শিক্ষক জামাল শালাবি অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-বিরেহ এলাকায় থাকেন, কিন্তু ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে শিক্ষকতা করছেন; প্রতিদিন ইসরায়েলি তল্লাশি চৌকি পেরিয়ে তাঁকে যাতায়াত করতে হয়।
শালাবি জানান, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানিয়েছে, তিনি সেই ১৮০ জন ফিলিস্তিনি শিক্ষকের একজন, যাদের পূর্ব জেরুজালেমে প্রবেশের ভ্রমণ অনুমতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের শেষে মেয়াদ শেষ হলে বাতিল করা হবে।
শিক্ষকদের জন্য অনুমতি এমনিতেও সমস্যা ছিল। এ বছর অনুমতিপত্র দেওয়া ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিলম্বিত হয়—শিক্ষাবর্ষ শুরুর দুই সপ্তাহ পর। গত জানুয়ারিতেও অনুমতি দিতে দেরি হয়েছিল। জানুয়ারি ও সেপ্টেম্বরের এই দুই বিলম্বের পর পূর্ব জেরুজালেমে স্কুল ধর্মঘট হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল চাপ তৈরি করা এবং এসব ইসরায়েলি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখানো।
শালাবি ব্যাখ্যা করেন, অনুমতি অনুমোদিত হলেও তা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ: নথিগুলো শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার করা যায়, সেই সময় অতিক্রম করা যায় না, এবং শিক্ষকদের স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও থাকা নিষেধ। তাঁর ভাষায়, ‘২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধের পর থেকে এই অনুমতি-বিধিনিষেধ রয়েছে; আমরা আর নামাজ পড়তে আল-আকসা মসজিদে পৌঁছাতে পারি না, শিক্ষার্থীদের স্কুল ভ্রমণেও সঙ্গে যেতে পারি না, কারণ অনুমতি কঠোরভাবে কর্মস্থলেই সীমাবদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সাম্প্রতিক ইহুদি ছুটি সুক্কোতের সময় পুরো এক সপ্তাহ আমাদের জেরুজালেমে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল।’
শিক্ষকদের অনুমতির বিধিনিষেধের পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শিক্ষাকে প্রভাবিত করছে আরও কিছু পদক্ষেপ। ইসরায়েলি সরকার অনুমোদিত একটি পরিকল্পনা, যার ঘোষিত উদ্দেশ্য পূর্ব জেরুজালেমে ‘আর্থসামাজিক বৈষম্য কমানো’, তার আওতায় ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম পড়ুয়াদের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে; নতুন স্কুলের জন্য তহবিলের শর্ত হিসেবে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ইসরায়েলি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে শিক্ষক প্রশিক্ষণের কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠন ইর আমিমের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এই নীতিগুলো শিক্ষাগত চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনি শিক্ষার স্বায়ত্তশাসন এবং এর জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি দুর্বল করছে। প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ফিলিস্তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করে এমন একটি আইনের পরিণতি নিয়েও; এই পদক্ষেপ পূর্ব জেরুজালেমের স্কুলগুলোয় বিদ্যমান শিক্ষকসংকট আরও বাড়াতে পারে।
ইর আমিমের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমের জন্য ইসরায়েলি সরকারের পরিকল্পনার আওতায় বরাদ্দ শিক্ষা বাজেটের প্রায় অর্ধেক ইসরায়েলি পাঠ্যক্রমের শিক্ষা সম্প্রসারণে নির্দেশিত। নতুন রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের স্কুল খোলার পূর্বশর্ত হিসেবেও এই পাঠ্যক্রম গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
সংখ্যার দিক থেকে, ১৫ বছর আগে পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রমে পড়া ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী ছিল মাত্র শখানেক। ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ হাজারের বেশি হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তা প্রায় ২০ হাজারে পৌঁছায় এবং ইর আমিমের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী পরের বছর তা ২৭ হাজারের বেশি হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অনুমান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে এখন ৪৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী—শহরের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৮ শতাংশ—ইসরায়েলি পাঠ্যক্রমে পড়ছে।
পূর্ব জেরুজালেমের একটি স্কুলের অধ্যক্ষ, যিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন, তিনি বলেন, এই নীতি শুধু ইসরায়েলি পৌরসভার সঙ্গে সংযুক্ত সরকারি স্কুলেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বেসরকারি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক স্কুলগুলোতেও প্রসারিত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, পৌরসভার তত্ত্বাবধানে ছাপানো একটি বিকৃত সংস্করণ দিয়ে ফিলিস্তিনি পাঠ্যক্রম প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চলছে, যা ফিলিস্তিনি ইতিহাস, ভূগোল ও জাতীয় পরিচিতি মুছে ফেলে ও বিকৃত করে।
অধ্যক্ষ আরও জানান, ইসরায়েলি পাঠ্যক্রমের ক্লাস চালু করতে অস্বীকৃতি জানালে স্কুলগুলো তহবিল, আর্থিক সহায়তা ও পরিচালনার লাইসেন্স হারানোর সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে। তাঁর মতে, এর মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে তদারকি ও নজরদারি, শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ তল্লাশি করে আসল ফিলিস্তিনি পাঠ্যবই জব্দ করা, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নিয়োগে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং নির্দেশ না মানলে লাইসেন্স বাতিল করা। এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রেণিকক্ষের ঘাটতিও বড় সংকট। ইর আমিমের হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমের স্কুলগুলোয় ২ হাজার ২৮৩টি শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি রয়েছে। সংগঠনটির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জেরুজালেম পৌরসভার নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও সংকট মিটবে না; ২০৩২ সাল নাগাদ প্রায় ১ হাজার ১০০ শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি থেকে যাবে। পৌরসভার হিসাব বর্তমান ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৫০০, যা ইর আমিম পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা বলে আপত্তি জানিয়েছে।
জেরুজালেম স্কুলগুলোর অভিভাবক কমিটি ইউনিয়নের মুখপাত্র রমাদান আওয়াদ জানান, কিছু শ্রেণিকক্ষে ৪২ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকে। তাঁর মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি ভাড়া নিয়ে স্কুলে রূপান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে; এসব জায়গায় প্রায়ই খোলা প্রাঙ্গণ, গবেষণাগার ও পাঠক্রম-বহির্ভূত কার্যক্রমের কক্ষের মতো একটি যথাযথ স্কুলের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য থাকে না।




