বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়: জাতীয় প্রেসক্লাবে সুরঞ্জন ঘোষ

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য ফোরামের সভাপতি সুরঞ্জন ঘোষ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের করদ রাজ্য নয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এ দেশের জনগণই।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করা হয় ভারতে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন ঘেরাও এবং বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগের প্রতিবাদে।
লিখিত বক্তব্যে সুরঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘আমাদের মূল দর্শন বিভেদ নয়, ঐক্য। ধর্ম যার যার, বাংলাদেশ সবার। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কিংবা গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সমর্থকদের মিছিল এবং কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সবার রয়েছে, তবে কোনো দেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার চেষ্টা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়।
সুরঞ্জন ঘোষ বলেন, ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাগতিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই অনুযায়ী তিনি ভারতের কাছে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চান, অসম সম্পর্ক নয়; সহযোগিতা চান, আধিপত্য নয়। গত ৩ নভেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্কের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, বন্ধুত্বের ঘোষণা বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সুরঞ্জন ঘোষ। মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে চলমান জাতিগত সংঘাতে বহু মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্থাপনা ও বসতবাড়িতে হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনক। একইভাবে দলিত, মুসলিম, খ্রিস্টান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে; এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা হোক, তবে কোনো দেশের শ্রমিক আন্দোলন যেন অন্য দেশের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাঁদের বক্তব্য ভারতের জনগণ, হিন্দু ধর্মাবলম্বী কিংবা কোনো জাতিগত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; তাঁদের সমালোচনা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উগ্রবাদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অন্যায় হলে যেমন তাঁরা প্রতিবাদ করবেন, তেমনি ভারতেও মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন হলে প্রতিবাদ জানাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি ১০ দফা দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সম্মান জানানো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্থাপিত আন্তরাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করা এবং মণিপুরসহ ভারতের সব ধর্মীয় ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দলিত, মুসলিম, খ্রিস্টান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ, বিচারাধীন বন্দিদের দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার, বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা।
সুরঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘আমরা ভারতের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ আত্মসমর্পণ নয়, সুসম্পর্কের অর্থ জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন নয়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা আপসহীন।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান, সহসভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন, সদস্য মেজর আব্দুর রওফ, অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ মজুমদার, দেবপ্রিয় ভিক্ষুসহ সংগঠনের অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।




