সুনামগঞ্জের হাওরে পানি নামতে জাগছে বোরো জমি, প্রণোদনা ও বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

বর্ষার ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকা সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে এক ফসলি বোরো আবাদের জমি। কোথাও চলছে বীজতলা তৈরির কাজ, কোথাও জমি প্রস্তুত করছেন কৃষকেরা।
নতুন মৌসুমের এই ব্যস্ততার মধ্যেও কৃষকদের মনে স্বস্তি নেই। সময়মতো সরকারি সার-বীজের প্রণোদনা না পাওয়া, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম এবং আগাম পাহাড়ি ঢলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ভাবিয়ে তুলছে হাওরপাড়ের কৃষকদের।
সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার কৃষকদের প্রধান জীবিকা বোরো ধান। এই একটি ফসলের ওপর নির্ভর করে চলে তাদের পরিবারের সারা বছরের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ। ফলে বোরো ফসলের সামান্য ক্ষতিও কৃষকের পরিবারে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নতুন মৌসুমের শুরুতেই সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ায় অনেক কৃষক নিজেদের টাকায় বাজার থেকে বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করছেন।
কৃষকদের বড় দুশ্চিন্তা ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়েও। তাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের মান ও অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কোথাও নিম্নমানের কাজ, কোথাও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফলে আগাম পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করলে তলিয়ে যেতে পারে সারা বছরের একমাত্র ফসল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন। শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের হিসাবে, সুনামগঞ্জের বোরো ধান দিয়ে দেশের প্রায় ১৭ দিনের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
এত বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদনের পরও কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত আর্থিক স্বস্তি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, সার, বীজ, শ্রমিকসহ কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না।
২০১৬-১৭ সালের আগে সুনামগঞ্জে ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হতো। ওই সময় বন্যায় জেলার ব্যাপক ফসলহানির পর হাওরজুড়ে খাদ্য ও জীবিকার সংকট দেখা দেয়। পরে স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা চালু করে সরকার। তবে পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার ও কাজের মান নিয়ে অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি বলে দাবি কৃষকদের।
কৃষক মাহবুব আহমদ বলেন, ‘এক ফসলি বোরো ধান রক্ষার বাঁধ নির্মাণে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের ক্ষেত্রে চুরিচামারি হয়। এতে যারা বাঁধের দায়িত্বে থাকেন, তাদের পকেট ভারী হয়। নানা সমস্যায় ধান চাষ করে লাভবান হতে পারছি না। আগামীতে আর ধান চাষ করব না। আগে দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলাম, আবারও চলে যাব।’
কৃষক জামিল মিয়া বলেন, ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। তারপরও বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় এবারও চাষাবাদ শুরু করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘জানি ক্ষতিগ্রস্ত হব, কিন্তু জমি পতিত রাখা যাবে না। খাওয়াও তো লাগবে।’
আরেক কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, সরকারি সার ও বীজ সময়মতো পাওয়া যায় না। প্রণোদনার সহায়তা আসার আগেই বাজার থেকে বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করতে হয়। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সার ও বীজের ব্যবস্থা করা হলে দরিদ্র কৃষকদের উপকার হতো।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, সরকারি প্রণোদনার বরাদ্দ এখনো আসেনি। অনুমোদন না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে তা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এবার আগের তুলনায় প্রণোদনার পরিমাণ কমে যেতে পারে। তবে কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।



