সিলেটে ৪০ দিনের অভিযানেও কমছে না মশার উপদ্রব, ২৪০ কর্মীর জায়গায় কাজ করছেন ১১৫ জন

সিলেট নগরে মশা নিয়ন্ত্রণে চলছে ৪০ দিনের বিশেষ অভিযান। প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, ধ্বংস করা হচ্ছে মশার লার্ভা। কিন্তু এত আয়োজনের পরও নগরবাসীর ভোগান্তি কমছে না—সন্ধ্যার পর ঘরে-বাইরে বেড়ে যাচ্ছে মশার উৎপাত।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৪২টি ওয়ার্ডে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একাধিক সমস্যার মুখে পড়ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি, পরিত্যক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, ড্রেন পরিষ্কারে ধীরগতি এবং নাগরিকদের অসচেতনতা মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে অভিযান চললেও মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে নগরের অনেক আবাসিক এলাকায় বছরের পর বছর পড়ে থাকা খালি জমি এখন মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এসব জমির মালিকদের একটি বড় অংশ প্রবাসে থাকায় নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে নগরের সব এলাকায় একসঙ্গে কার্যক্রম চালানোর মতো লোকবলও সিটি করপোরেশনের নেই।
নগরের আম্বরখানা এলাকার বাসিন্দা রাজনারায়ন চৌধুরী বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বাসায় বসে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও মশা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েল জ্বালিয়েও কাজ হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের লোকজন ওষুধ ছিটালেও মশার উৎপাত কমছে না।’
পাঠানটুলা এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবেদিন বলেন, ‘আমাদের আশপাশে অনেক খালি জায়গা পড়ে আছে। কোথাও ঝোপঝাড়, কোথাও পানি জমে থাকে। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। শুধু রাস্তায় ওষুধ ছিটিয়ে মশা কমানো যাবে না। যেসব জায়গায় মশা জন্মাচ্ছে, সেগুলোও পরিষ্কার করতে হবে।’
এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, সিলেটের অনেক খালি প্লটের মালিক প্রবাসে থাকেন। জমি দেখাশোনার জন্য সেখানে দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হয়। তিনি বলেন, জমিতে ময়লা থাকলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অভিযান চালাতে গিয়ে অনেক সময় মালিকপক্ষের কাউকে পান না। এ ক্ষেত্রে জমিতে আইনি নোটিশ টাঙানো হলে মালিক কিংবা তাঁদের প্রতিনিধি যোগাযোগ করেন। নাগরিকদের ভোগান্তি বেশি হলে সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে এসব জমি থেকে ময়লা সরিয়ে নেয়। তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না তিনি।
মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ড্রেন, নালা ও ছড়া পরিষ্কার রাখা জরুরি। কিন্তু এ কাজে স্বাস্থ্য বিভাগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কার্যক্রমের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, মশকনিধন কার্যক্রম দ্রুত চালানো গেলেও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে তুলনামূলক ধীরগতিতে।
নিজের বাসার এলাকার উদাহরণ দিয়ে ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, নগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের চালিবন্দরে একটি ড্রেন পরিষ্কারে ছয় দিন ধরে পাঁচজন কর্মী কাজ করেও ১০০ গজ অংশ শেষ করতে পারেননি। অথচ ওই এলাকায় ওষুধ ছিটাতে বা লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে স্প্রেকর্মীদের সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। তাঁর মতে, একটি ছড়া পরিষ্কার করতে এক মাস সময় লাগলেও সেখানে ওষুধ প্রয়োগের কাজ দুই দিনে শেষ করা সম্ভব। তাই ড্রেন ও ছড়া পরিষ্কারের কাজ দ্রুত না হলে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের সুফল ধরে রাখা কঠিন।
তবে এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ একলিম আবদীন। তাঁর দাবি, ড্রেন পরিষ্কারের কাজ নিয়মিত চলছে। নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে ড্রেন ও ছড়ায় বারবার বর্জ্য জমছে, ফলে সারা বছরই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
সিলেট নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর জন্য সিসিকের প্রয়োজন অন্তত ২৪০ জন কর্মী। কিন্তু বর্তমানে এ কাজে নিয়োজিত আছেন প্রায় ১১৫ জন। ফলে বিশাল নগর এলাকার সব জায়গায় একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, আগে এডিস মশার লার্ভা অনুসন্ধান ও মশকনিধনের কাজে নিয়মিত কর্মী ছিলেন ৪০ জন; পরে সংখ্যা বাড়িয়ে ১১৫ করা হয়েছে। তারপরও প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী অনেক কম। তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করেও এই মুহূর্তে এত কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।’
নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর পরও মশার উপদ্রব না কমায় ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওষুধ ছিটানোর ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরই আবার মশার ঝাঁক দেখা যায়। তবে ওষুধের মান নিয়ে অভিযোগ নাকচ করেছেন ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, মশার লার্ভা ধ্বংসে ‘টেমিফস’ এবং পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে ‘মেলাথিয়ন ৫এস’ ব্যবহার করছে সিসিক। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি এসব ওষুধ সংগ্রহ করা হয়। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবার ওষুধ কেনার পর নমুনা আইইডিসিআর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়িতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়; পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলেই মাঠপর্যায়ে তা প্রয়োগ করা হয়। আগের তুলনায় ওষুধের গন্ধ কম পাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পণ্য ব্যবহারের কথা জানান।
মশার বিস্তারের পেছনে নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, অনেক বাসিন্দা নির্ধারিত ভ্যানে ময়লা না দিয়ে ড্রেন ও ছড়ায় ফেলছেন। এতে পানির চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মশার প্রজননের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের মাসিক ফি প্রসঙ্গে একলিম আবদীন বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে নেওয়া বর্জ্য কর দিয়ে মূলত নগরের সড়ক, নালা-ড্রেন ও ছড়া পরিষ্কারের কাজ করা হয়; বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্থানীয় ক্লাব ও সংগঠন। একটি ভ্যানগাড়ি প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৫০টি বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহ করতে পারে; প্রতিটি বাসা থেকে মাসে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা না পেলে ভ্যানচালকের আয় নিশ্চিত করা কঠিন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিলেট সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর নেই। ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, কাউন্সিলর না থাকায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল; সরকারি কর্মকর্তারা বিধিবিধান মেনে কাজ করলেও জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় সমস্যা ও মানুষের প্রত্যাশা সরাসরি বুঝতে পারেন, ফলে তাৎক্ষণিক নাগরিক সেবায় তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন একলিম আবদীন। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল বিভাগের মধ্যে সমন্বয় ভালো রয়েছে; প্রশাসকের নেতৃত্ব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে তিনটি বিভাগ একসঙ্গে কাজ করছে। তবে দুই কর্মকর্তারই মত, শুধু সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দিয়ে নগরকে মশামুক্ত রাখা সম্ভব নয়—ব্যক্তিগত জমি, ভবনের ভেতরের ড্রেন ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব মালিকদেরও নিতে হবে।




